ফ্রান্সেসের প্রতি হেমিংওয়ের যে অনুরাগ, সেটিকে কখনোই নিরুৎসাহিত করেননি বোন মার্সেলিন। ইতালিতে ভাইয়ের কাছে লেখা এক চিঠিতে (৩ জুলাই ১৯১৮) তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার মনে হয় তুমি জেনেছ… ফ্রান্সেস কোটস আর জ্যাক গোসের মধ্যে বাগদান হয়ে গেছে। তুমি চলে যাওয়ার পরদিনই খবরটা প্রকাশ করা হয়! (বিচক্ষণ ফ্রান্সেস!)’ পরের মাসে (২৫ আগস্ট) তিনি আরেক চিঠিতে লেখেন, ‘আমার আগের চিঠিতে ফ্রান্সেস কোটস আর জ্যাক গোসের বাগদানের কথা লিখেছিলাম তোমাকে, তবে যা-ই হোক না কেন, ওকে বলব যাতে চিঠি লেখে তোমাকে। এখনো বিয়ে হয়নি ওর, তুমি জানো।’
বিয়ে হয়ে গেলেও হেমিংওয়ের সঙ্গে পত্রালাপ চালু ছিল ফ্রান্সেসের, এমনকি হেমিংওয়ের প্রথম বিয়ের পরও। হেমিংওয়ের কাছে ফ্রান্সেসের লেখা শেষ চিঠিটা ছিল ১৯২৭ সালের জানুয়ারি মাসে, সে মাসেই যে হ্যাডলির সঙ্গে হেমিংওয়ের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে, সেটা তখনো জানা ছিল না ফ্রান্সেসের। তত দিনে দ্য সান অলসো রাইজেস প্রকাশিত হয়েছে, হেমিংওয়ের প্রথম পুত্র জ্যাক ওরেফে বাম্পির বয়স তখন তিন বছর। সেই চিঠিতে ফ্রান্সেস লিখেছিলেন, ‘মাত্র তোমার দ্য সান অলসো রাইজেস পড়ে শেষ করলাম, আমার চোখের সামনে তুমি এত জীবন্ত হয়ে আছ যে বলতেই হবে, বইটা যে কী পরিমাণ উপভোগ করেছি আমি।…যত বছর যাচ্ছে, সময় তোমাকে এক আশ্চর্যজনক মানুষে পরিণত করছে—তোমাকে দেখতে পেলে খুব ভালো লাগত—এক বছরের বেশি হয়ে মার্সকে [মার্সেলিন] দেখিনি—কেউ একজন বলল, তুমি নাকি আসছ। তোমার ছেলের সঙ্গে মানাবে, এমন মুগ্ধ করার মতো সুন্দর একটা মেয়ে আছে আমার—তোমার চমৎকার হ্যাডলির সঙ্গে দেখা হলে খুব ভালো লাগবে আমার… জনও বলছে এই কথা, আমরা দুজনই তোমাদের দেখার অপেক্ষায় আছি।’ চিঠিতে এমন কথা লিখলেও ফ্রান্সেস তাঁর সঙ্গে হেমিংওয়ের ছবির ফ্রেমটার ওপর লিখেছিলেন, ‘আর্নির ছবি/ আর ২৫ বছর পর উফ্! জনকে বিয়ে করেছি বলে আমি কি খুশি!’
ইলিনয়ের ওক পার্ক ও মিশিগানের হর্টন বে এবং পেটোস্কি ছিল তরুণ হেমিংওয়ের প্রথম জীবনের রোমান্স এবং নারী সংসর্গের অভিজ্ঞতার প্রথম পাদপীঠ। এখানে তিনি প্রুডেন্স, মার্জোরি, কেট, পলিন রো, ফ্রান্সেস কোটস, ক্যাথরিন প্রমুখ তরুণীর সঙ্গে বিভিন্ন সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন, সেসবের স্থায়িত্ব ছিল স্বল্পকালীন এবং শেষ হয়েছিল পরিণতিহীনভাবে। বাস্তব জীবনের এসব সঙ্গিনীর অনেকেই উঠে এসেছেন তাঁর গল্প-উপন্যাসে, কেউবা এমনকি স্বনামে। এসবের কিছু কিছু খুঁজে বের করেছেন তাঁর গবেষকেরা, অন্যদের মধ্যে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন মার্জোরি বাম্প। কারণ, তাঁর মেয়ে জর্জিনা একটা বই প্রকাশ করে হেমিংওয়ের তারুণ্যে এই নারীর উপস্থিতি এবং পরবর্তী সময়ে গল্পে তাঁকে বিরূপভাবে চিত্রায়ণ করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। এখানে উল্লেখ করা উচিত, হ্যাডলিকে বিয়ে করার পর হেমিংওয়ে যখন মধুচন্দ্রিমা কাটাতে মিশিগানের ওয়ালুন লেক অঞ্চলে তাঁদের সামার হাউসে কিছুদিন থাকতে যান, সে সময় তিনি নববিবাহিত সঙ্গীকে নিয়ে তাঁর পুরোনো বান্ধবীদের বাড়ি ঘুরে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তাঁরা যে তাঁর মতো একজন পাত্র হারিয়েছেন কিংবা তাঁরা যে প্রতিযোগিতায় হেরে গেছেন, সেটা দেখানোই ছিল উদ্দেশ্য। ব্যাপারটা হ্যাডলির পছন্দ হয়নি। হেমিংওয়ের আরেক বান্ধবী গ্রেস কুইনল্যানের কাছে লেখা হেমিংওয়ের কয়েকটা দীর্ঘ চিঠি পাওয়া গেলেও তাঁদের মধ্যে কোনো রোমান্টিক সম্পর্ক ছিল বলে প্রমাণ নেই। জীবনীকার কনস্ট্যান্স চ্যাপেলকে হ্যাডলি বলেছিলেন যে তাঁর মনে হয়েছে মেয়েটি হেমিংওয়ের প্রেমে পড়েছিল। কুইনল্যানের সঙ্গে হেমিংওয়ের ঘনিষ্ঠতা ও যোগাযোগের গভীরতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে দ্বিধা আছে। কারণ, সে সময় তরুণ এই উঠতি লেখকের বান্ধবীদের মধ্যে গ্রেসেরও ছিল তাঁর জীবনসঙ্গিনী হওয়ার সম্ভাবনা। তাঁর কাছে লেখা চিঠিগুলোতে পাওয়া যায় হেমিংওয়ের প্রেমকাতুরে মনোভাব, যদিও গ্রেসকে তিনি বোন বলেও সম্বোধন করেছেন কোথাও কোথাও লিখেছেন ‘সব বোনের সেরা’। এই সম্পর্ক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনানন্দের ‘ক্যাম্পে’ কবিতার ‘হৃদয়ের বোন’-এর কথা। এই তরুণী অধরা জেনেই কি হেমিংওয়ে তাঁকে বোন সম্বোধন করার কথা ভেবেছেন? এ প্রসঙ্গে আমরা আরও স্মরণ করতে পারি, পরিণত বয়সে হেমিংওয়ে যখন খ্যাতির শিখরে, তখন সুন্দরী তরুণীদের কাউকে অবলীলায় ‘মা’ সম্বোধন করতেন তিনি। গ্রেসকে কখনো লিখেছেন ‘প্রিয় বোন লিউক,’ কখনো ‘প্রিয়তমা জি’, কখনো ‘ডিয়ার ওল্ড জি’। চিঠির শেষে কখনো লিখেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের পক্ষ থেকে ভালোবাসা,’ কখনো ‘ভালোবাসা (যা কিছু পেয়েছি আমি)’ ইত্যাদি। একটা চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘আমি খুশি যে তুমি একই রকম আছ, অতি প্রিয়, অতি সুন্দরী, বয়সের চেয়ে আরও পরিণত, পেটোস্কির যাদের সঙ্গে আছ, তাদের ব্যাপারে বেশ অসন্তুষ্ট (ঈশ্বরকে ধন্যবাদ)।’ তারপর ‘শুভরাত্রি পুরোনো প্রিয়তমা—অনেক ভালোবাসি তোমাকে’ লিখে শেষ করেন চিঠি। আরেকটা চিঠিতে তিনি লেখেন, গ্রেসের জন্মদিনের কথা জানতে পেরে তাঁর জন্য উপহার কিনতে গিয়ে দেখেন, তাঁর কাছে আছে মাত্র ৫৯ সেন্ট, সেটা দিয়ে স্ট্যাম্প কিনবেন নাকি তাঁকে একটা পত্রিকার গ্রাহক করে দেবেন—এসব ভাবতে ভাবতে কোনোটাই মনঃপূত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁরা তিন বন্ধু মিলে ওর নামে কয়েক প্রস্থ পান করেছিলেন। সেই চিঠিতে লেখেন যে গ্রেসের পঞ্চদশী হওয়া উপলক্ষে ওকে নিয়ে একটা কবিতা লিখেছেন তিনি। তারপর লেখেন, ‘ভাবলাম, তুমি মনে করবে কবিতা লেখা খুব একটা বোকার মতো কাজ, তাই ওটা আর পাঠাইনি তোমাকে।’ সেই চিঠিতে তিনি আরও লেখেন যে তিনি কতখানি ব্যথিত যে গ্রেস আগের মতো তাঁকে আর পছন্দ করেন না। ‘কারণ, অন্য যে কারও চেয়ে অনেক বেশি পছন্দ করতাম তোমাকে, আমি আহত হই যখন শুনি যে আড়ালে আমার সম্পর্কে নানান কথা বলো তুমি।’ ২১ জুলাই ১৯২১ তারিখে লেখা চিঠিতে দেখা যায়, প্রথমবারের মতো হ্যাডলির কথা গ্রেসকে জানাচ্ছেন হেমিংওয়ে। ১৯ আগস্টের চিঠিতে হ্যাডলির সঙ্গে তাঁর বিয়ের পুরোহিত হিসেবে গ্রেসের পরিচিত যাজকদের ভেতর থেকে একজনকে নিয়োগ করার জন্য সাহায্য চেয়েছিলেন হেমিংওয়ে। সেই অনুরোধ রক্ষা করে একজনকে ঠিক করে দিয়েছিলেন গ্রেস।
