লাঠির ঘূর্ণি, ঢোলের তালে তালে ছন্দময় কসরত—মুহূর্তেই যেন ফিরে এল গ্রামবাংলার হারানো এক ঐতিহ্য। একসময় যে লাঠিখেলা ছিল জনপদের বিনোদনের প্রাণ, আধুনিকতার ভিড়ে তা প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবে জামালপুর শহরের নাছিরপুরে ‘দুর্বার সংঘ’-এর উদ্যোগে সেই হারানো ঐতিহ্যই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল।
গতকাল শনিবার বিকালে নাছিরপুর এলাকার একটি মাঠে লাঠিখেলার আয়োজন করা হয়। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এই আয়োজন করে দুর্বার সংঘ। বিকেল চারটায় লাঠিখেলা শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে বৃষ্টির কারণে কিছুটা দেরি হয়; খেলা শুরু হয় পাঁচটার দিকে। এর আগেই বাদ্যযন্ত্র বাজাতে থাকে লাঠিয়াল দলের বাদক দল। গ্রামের নবীন-প্রবীণসহ সব বয়সের মানুষ জড়ো হন। লাঠিখেলা দেখতে নাছিরপুর ছাড়াও পাশের লাঙ্গলজোড়া, মাছিমপুর, শরিফপুরসহ বিভিন্ন এলাকার নানা বয়সী মানুষ ভিড় করেন।
লাঙ্গলজোড়া গ্রামের ইজিবাইকচালক আবদুল খালেক মেয়ে আঁখি আক্তারকে (৬) নিয়ে লাঠিখেলা দেখতে এসেছেন। খালেক বলেন, দুই দশক আগেও গ্রামে নিয়মিত লাঠিখেলা হতো। খেলা দেখতে গ্রামে মানুষের ঢল নামত। প্রতিবছর বিভিন্ন সময়ে যেন এ খেলার আয়োজন করা হয়।
নাছিরপুর এলাকার গৃহবধূ শাহনাজ বেগম দুই সন্তানকে নিয়ে এ লাঠিখেলা দেখতে এসেছেন। তিনি বলেন, আগে আমন ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের মাঠগুলো খেলাধুলায় ভরে উঠত। লাঠিখেলা, গাদন, ডাংগুলি, ফুটবলসহ নানা খেলায় মেতে উঠত গ্রামের ছেলেমেয়েরা। পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে যাত্রা, জারিগানসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এখন আর এসবের আয়োজন করা হয় না।
মাছিমপুর এলাকা থেকে ছাবেদ আলী (৬৭) নামের এক প্রবীণ তাঁর দুই নাতিকে নিয়ে খেলা দেখতে এসেছেন। লাঠিয়ালদের লাঠির ঘূর্ণিতে তিনিও মাঝেমধ্যে লাফ দিচ্ছিলেন। পরে লাঠিখেলা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, দর্শকদের সামনে একের পর এক মনোমুগ্ধকর কৌশল আর সাহসিকতায় ভরপুর লাঠিখেলার প্রদর্শনী তাঁকে মুগ্ধ করেছে। অনেক দিন পর আবারও সেই শৈশবের দিনগুলোয় ফিরে গিয়েছিলেন তিনি।
আয়োজক কমিটির কয়েকজন বলেন, এ খেলা দেখতে দুপুর থেকে আশপাশের এলাকা থেকে বিভিন্ন বয়সের মানুষ জড়ো হতে থাকেন। লাঠিয়ালদের বিভিন্ন কৌশলের সময় দর্শকদের উচ্ছ্বাস, হাততালিতে আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্য শুধু বিনোদনই নয়, বরং সংস্কৃতি আর ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ধরনের আয়োজন সব সময় রাখার চেষ্টা করা হবে। কারণ, খেলা দেখতে আসা দর্শকদের এ দাবি।

দুর্বার সংঘের সভাপতি তানজিনুল ইসলাম বলেন, বাংলা নববর্ষকে ঘিরে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলার আয়োজন তাঁদের দীর্ঘদিনের চর্চা। আগেও এ আয়োজন করা হয়েছে, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তিনি বলেন, ছোটবেলায় তাঁদের বাপ-চাচাদের কাছেই এ খেলার সঙ্গে প্রথম পরিচয়; সেই স্মৃতিই তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। নতুন প্রজন্ম যেন এই ঐতিহ্যকে কাছ থেকে দেখতে, শিখতে এবং নিজেদের মধ্যে ধারণ করতে পারে—সে লক্ষ্যেই এ আয়োজন। লাঠিখেলাকে ঘিরে মানুষের ব্যাপক সাড়া তাঁদের এ উদ্যোগকে আরও উৎসাহিত করছে। অন্যান্য সময়েও এ খেলার আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
