নর্ডিক দেশগুলো কবিতার মতো। মাথায় তাদের অরোরার মুকুট। শরীরটা রুপালি বার্চগাছের। পায়ের কাছে ফিওর্ডের জল। বছরের বেশিরভাগ সময় বরফে ঢাকা এই দেশগুলোর কবিতা তাই এক অদ্ভুত প্রশান্ত রূপের প্রতিচ্ছবি।
এইসব দেশের কবিরা অনুপ্রেরণা পান প্রকৃতি থেকে—পান শক্তি ঘন বন, নীল হ্রদ, আর অরোরার নেচে নেচে যাওয়া আলো থেকে। তাঁদের কবিতায় জীবনের প্যাস্টেল রঙের ফুল ফোটে—হালকা নীল-বেগুনি-গোলাপি-সাদা। নর্ডিক দেশগুলোর প্রকৃতি তার সৌন্দর্যের একাকীত্ব দিয়ে বিশেষভাবেই মানুষকে টানে। আর তাই ফিনল্যাণ্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক, আইসল্যাণ্ড, গ্রীনল্যাণ্ড, ফারোইজ দ্বীপপুঞ্জ, সুইডেনের কবিতায় স্মৃতি, মৃত্যু এবং জটিল আবেগের সঙ্গে ফুটে ওঠে বরফযুগে গ্লেসিয়ার ক্ষয়ে তৈরি হওয়া গভীর, সরু সমুদ্রখাত; আগ্নেয়গিরি ও হিমবাহ, আগুন ও বরফের সহাবস্থান; জাদুময় অরোরা এবং ক্রমাগত পরিবর্তনশীল আকাশের রূপ; রেইনডিয়ার, বুনো পনি…
সেইসব কবিতায় থাকে পুরাণ ও বীরত্বগাথা থেকে শুরু করে প্রেম, বেদনা ও দৈনন্দিন জীবনের গল্প। থাকে গভীর ভালোবাসা, বিষণ্নতা, রৌদ্রকরোজ্জ্বল দক্ষিণ ও শীতল উত্তরের বৈপরীত্য।
ফিনল্যাণ্ডের কবিতা
মূল: রিস্তো উলাভি রাসা
ইংরেজি অনুবাদ: আন্নিনা ইয়োকিনেন
১.
সে খুব একা ছিল,
খবরের কাগজের অর্ডার করল
যেন অন্তত কেউ তার দরজায় আসে।
২.
সকাল হয়েছে।
বারান্দার রেলিং থেকে একটা চড়ুই লাফিয়ে
রান্নাঘরের জানালার নিচে এসে দেখে
মা টেবিলক্লথটা ঝেড়েছেন কিনা।
নরওয়ের কবিতা
নরওয়েজিয়ান মূল: তারইয়ে ভেসাস
ইংরেজি অনুবাদক: ফ্রেদেরিক ফ্লেইশার
কাচের দেয়াল
আমার আর তোমার মাঝে
দাঁড়িয়ে আছে শব্দহীন হাওয়া
এক কাচের দেয়ালের মতো।
প্রত্যেকবার যখনই তোমার দিকে তাকাই,
তুমি কিছু বলতে চাও,
আমাকে ডাকো—
কিন্তু একটি শব্দও আমার কাছে পৌঁছায় না।
তোমার চোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে যায়,
আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তুমি কিছু পড়তে চাও—
আমিও তীব্র কষ্টে তোমাকে ডেকে যাই।
হ্যাঁ, এইসব মুহূর্তে তুমি ঠোঁটটা চেপে ধরো
কাচের উল্টো দিকে এক উত্তেজিত শিশুর মতো,
ফলে মুখটা ভেঙেচুরে যায়।
তুমি অন্য দিকটায় হেলান দিয়ে থাকো,
কামনায় টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া ঠোঁট—
সবকিছু স্তব্ধ, নিশ্চুপ।
ডেনমার্কের কবিতা
মূল: এমিল আরেস্ত্রুপ
ড্যানিশ থেকে ইংরেজি অনুবাদ: জ্যাক ব্রনডাম ও পিয়ার এল. আরেস্ত্রুপ
যখন নিজে নিজে ঘুরে বেড়াই
যখন নিজে নিজে ঘুরে বেড়াই
হেঁটে বেড়াই সুতীব্র আকাঙ্ক্ষায়, নিঃশব্দে
ঠিক তখন আমার আত্মা জেগে ওঠে,
ঠিক তখন আমার ভাবনাগুলো ভেসে আসে।
আমার চেতনাশক্তি দ্বিগুণ হয়ে জেগে উঠে
আমার মাথার চারপাশে যে
আলোকোজ্জ্বল বিশৃঙ্খলা
অবিরাম ঝিকিমিকি করে
তার মাপ নেয়।
সৌন্দর্যের অন্তরঙ্গ সান্নিধ্যে
আর তার বিস্ময়-ঢাকা রহস্যে আপ্লুত হয়ে,
তোমার সত্তাকে আমি বুকে লালন করি—
মুক্ত, কিন্তু অনড়।
কোমল ছন্দে সাইকির পাখা
ছুঁয়ে যায় তোমার কাঁধ,
তোমার অপরূপ কেশরাশি দুলতে থাকে—
অমৃত-আনন্দে, অনন্তকাল।
স্বর্গের দেবদূতদের রূপ
আর মুক্তির আলোকপথ দেখাতে চেয়ে
দান্তের বিয়াত্রিচের মতো
তুমি আলতো করে আমার হাত ধরো।
আমার দিন উজ্জ্বল হয়ে উঠবে ভেবে
অনেকের কথায় আমি ভোজের আসরে বেশ আনন্দ পাই বলে
যখন কোনো বন্ধু আমাকে ডাকে,
শুধু তখনই—
ঠিক তখনই জীবন
হঠাৎ করে যেন বেরিয়ে আসে তার গোপন আড়াল থেকে—
তথাকথিত বাস্তবতার ওপার থেকে,
আর মনে হয় আমি যেন স্বপ্নের ভিতর আছি
উজ্বল হয়ে, ম্লান হয়ে,
কুয়াশায় নিজেকে আড়াল করে—
সেই সময়ই আমার আত্মা ঘুমিয়ে পড়ে,
শুধু দেহটি জেগে থাকে নিরবে।
