১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্ট্রং আর বাজ অলড্রিনকে চাঁদে পাঠাতে নাসার প্রায় চার লাখ কর্মী আর ঠিকাদারের একসঙ্গে কাজ করতে হয়েছিল। কিন্তু এই পুরো ঘটনা একটি সাজানো নাটক, এমন ধারণা ছড়িয়ে দিতে একজন লোকের চেষ্টাই যথেষ্ট ছিল। যাঁর নাম বিল কেইসিং। এই লোকের কারণেই এখনো বহু মানুষ মনে করে, চাঁদে যাওয়া বুঝি একটা সাজানো নাটক। কথায় কথায় বলে, ‘আমার মনে হয়…মানুষ চাঁদে যায়নি।’
শুরুতে চাঁদে না যাওয়ার ধারণাটি ছিল কেইসিংয়ের ‘মনে হচ্ছে’ বা ‘অনুভূতি’, যা পরে হয়ে যায় কেইসিংয়ের ‘দৃঢ় বিশ্বাসে’। তাঁর মনে হয়েছিল, চাঁদে যাওয়ার (কিংবা অন্তত চাঁদ থেকে নিরাপদে ফিরে আসা) মতো কারিগরি সক্ষমতা আমেরিকার নেই। কেইসিং আসলে আমেরিকার মহাকাশ কর্মসূচির সঙ্গে কিছুটা যুক্তও ছিলেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত তিনি ‘রকেটডাইন’ নামক একটি সংস্থায় কাজ করেছিলেন, যারা স্যাটার্ন ফাইভ রকেটের ইঞ্জিন নকশায় সহায়তা করেছিল। ১৯৭৬ সালে তিনি নিজ উদ্যোগে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন, যার নাম ছিল আমরা কখনো চাঁদে যাইনি: আমেরিকার তিন হাজার কোটি ডলারের জালিয়াতি। নিম্নমানের ফটোকপি আর অদ্ভুত সব তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি তাঁর বিশ্বাসের সপক্ষে প্রমাণ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, তাঁর সেই ধারণাগুলো আজ পর্যন্ত হলিউডের সিনেমা, ফক্স নিউজের তথ্যচিত্র, রেডিট বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে টিকে আছে।
চন্দ্রাভিযানের সপক্ষে পাহাড়সম প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কিছু মানুষ কখনো বিশ্বাস করে না যে মানুষ চাঁদে গিয়েছে। যেমন চাঁদে ছয়টি অভিযানে সংগৃহীত হয়েছে ৩৮২ কেজি চাঁদের মাটি। রাশিয়া, জাপান ও চীন সেই মাটি পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেছে, এটি চাঁদের মাটি।
নাসার লুনার রিকনসেন্স অরবিটারের পাঠানো ছবিগুলোতে মহাকাশচারীদের পায়ের ছাপ স্পষ্ট দেখা যায়। তবু চাঁদ নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জনপ্রিয়তা ১৯৬৯ সালের পর থেকে কেবল বেড়েছেই। যারা পৃথিবীকে চ্যাপ্টা বা ফ্ল্যাট আর্থ মনে করে কিংবা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাকে অস্বীকার করে, তাদের কাছে চন্দ্রাভিযান ভুয়া হওয়াটা কোনো বিতর্কের বিষয় নয়। তারা একে অকাট্য সত্য মনে করে।
পডকাস্টের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব জো রোগান কিংবা ইউটিউবার শেন ডসনও এই সংশয়বাদীদের দলে আছেন। এমনকি কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির এক সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক তাঁর ছাত্রদের কাছে দাবি করেছিলেন, চাঁদে নামার ঘটনাটি ছিল মিথ্যা। কেইসিং যখন ফটোকপির মাধ্যমে বিশ্বকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন, এখনকার ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীরা সেই তুলনায় অনেক এগিয়ে। তারা এখন ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে অদ্ভুত সব যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করে।
আসলে এখন ইন্টারনেটের কারণে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশিসংখ্যক মানুষের কাছে যা খুশি বলার সুযোগ পায়। ইন্টারনেট যত অবাধ হয়েছে, তত বেশিসংখ্যক মানুষ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ভালোবেসেছে। এখন যেকোনো বড় কিছু ঘটুক না কেন, কেউ না কেউ এর উল্টো ব্যাখ্যা দাঁড় করাবেই।
যুক্তরাজ্যের মানুষেরাও ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। যুক্তরাজ্যের এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এক অতিথি দাবি করেছিলেন, কেউ চাঁদে হাঁটতে পারে না; কারণ, চাঁদ আসলে আলো দিয়ে তৈরি! এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ছয়জন ব্রিটিশ নাগরিকের মধ্যে একজন মনে করেন, চন্দ্রাভিযানটি সাজানো ছিল। ২৪ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে এই বিশ্বাস সবচেয়ে প্রবল।
কেইসিংয়ের সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোই আজকের অবিশ্বাসের পেছনে আছে। যেমন ছবিতে কেন কোনো নক্ষত্র দেখা যাচ্ছে না? ল্যান্ডিং মডিউলের নিচে কেন কোনো গর্ত নেই? কিংবা ছায়াগুলো কেন অদ্ভুতভাবে পড়েছে? যারা বিষয়টি বোঝেন, তাঁরা এসব ‘অসংগতি’ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করেছেন। ক্যামেরা এক্সপোজারের সময় কিংবা শূন্যস্থানে বাতাসের অভাবই যে এসবের কারণ, তা তাঁরা বারবার দেখিয়েছেন। কিন্তু ২০০৫ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত কেইসিং তাঁর দাবিতে অটল ছিলেন। তাঁর মতে, পুরো বিষয়টি একটি স্টুডিওতে ধারণ করা জালিয়াতি। তিনি বলতেন, নাসার ব্যবস্থাপনা চাঁদে যাওয়ার আগপর্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ ছিল। সেখানে ১৯৬৯ সালের পর হঠাৎ করেই একের পর এক মানব মিশন সফল হওয়াটা পরিসংখ্যানগতভাবে অসম্ভব।
