‘শত-সহস্র’ বছর ধরে বয়ে চলছে নদী সুরমা।

পাড়ে শিমুলতলা গ্রাম। উপজেলা ছাতক। জেলা সুনামগঞ্জ।

এ গ্রামেই ১৯৮৫ সালের ১ জুন জন্ম নেন পাগল হাসান, যাঁর মূল নাম মো. মতিউর রহমান হাসান।

বয়স যখন অল্প, তখন হাসানের কৃষক বাবা দিলোয়ার হোসেন দিলশাদ মারা যান। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া হাসান সে বয়সেই জেনে যান, পুরো জীবনটাই গান, পুরো জীবনটাই সুর, যেন–বা এক দুঃখনদী।

এ-ও জানা হয়ে যায় হাসানের, গান লিখতে হলে বুকভরা পরম দুঃখের দরকার।

বাবা মারা যাওয়ার পর অভাব, অনটন আর দুঃখ সেই যে হাসানের সঙ্গী হয়েছিল; তা আর দূর হয়নি। ৩৯ বছর যে জীবন কাটিয়ে গেলেন, দুঃখ আর তাঁর পিছু ছাড়েনি। গানেও তাই বারবার দুঃখ এসেছে। একটা গানে তিনি লিখেছিলেন, ‘পাগল হাসানের বুকেতে দুঃখ সীমাহীন…’

যে আয়ু পেয়েছিলেন পাগল হাসান; এর ভেতর বাবা হারানোর বেদনা, টানাপোড়েন, প্রেমিকাকে না পাওয়ার দুঃখবোধ, প্রথম স্ত্রী লুৎফা বেগমের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ—সবই তাঁর ছোট্ট জীবনের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা হয়েছিল। সবকিছুকে পাশাপাশি রেখেই থিতু হন বাউলগানে। সেখানেই খুঁজে নেন জন্ম আর বেঁচে থাকার যাবতীয় মানে। পোড়-খাওয়া ‘জোড়াতালির জীবন’যাপনের অভিজ্ঞতায় দার্শনিক মন্তব্য বেরোয় তাঁর কণ্ঠে: ‘গান লিখতে হলে পরম দুঃখের দরকার। প্রয়োজন পরম সুখেরও…’

পাগল হাসানের জীবনে প্রকৃত সুখ কখনো এসেছিল কি না, জানা নেই। তবে তাঁর জীবনের পরতে পরতে আমৃত্যু স্রোতস্বিনী এক দুঃখনদী বয়ে গেছে, সেটা তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকার আর রচিত গান পাঠ করে বা শুনে সহজেই অনুমান করা যায়। দুঃখ-কষ্টে আকণ্ঠ নিমজ্জিত পাগল হাসান গানেই যে সুখ খুঁজে পেয়েছেন, সেটাও অনুভব করা যায় তাঁর আচার-আচরণে।

পাগল হাসান গানে এতটাই মোহাচ্ছন্ন থাকতেন, হয়তো সে কারণেই সন্ধ্যায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে ভাঙা হাতে প্লাস্টার বেঁধে রাতেই হাজির হাজারো দর্শক-শ্রোতার সামনে; গানের মজমায়, চিরচেনা রূপে। সুর-গানে নিমজ্জিত হাসান ভুলে যান কিছুক্ষণ আগে দুর্ঘটনায় হাড় ভেঙে যাওয়া হাতের যন্ত্রণা, ব্যথাকে পরোয়া না করে কণ্ঠে তুলে নেন তাঁরই লেখা বহুল প্রচলিত গান:

‘আন্ধাইরপুরীর মানুষ আমি
আন্ধাইরপুরীর মানুষ আমি, আন্ধাইর ঘরের বাসিন্দা
ও আল্লা ও আল্লা, আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা
ও আল্লা ও আল্লা, আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা।
রুহুটারে কবজা কইরা, আজরাইলে নিব ধইরা
রুহুটারে কবজা কইরা, আজরাইলে নিব ধইরা
শূন্য কায়া রইবে পইড়া, শূন্য কায়া রইবে পইড়া
কে শুনবে কার কান্দা গো!
ও আল্লা ও আল্লা আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা
ও আল্লা ও আল্লা আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা।

ও আন্ধাইর ঘরের রাস্তা সোজা, ঘাড়ে লইয়া পারের বোঝা
আন্ধাইর ঘরের রাস্তা সোজা, ঘাড়ে লইয়া পারের বোঝা
আল্লা রাসুল মুর্শিদ ভজা, আল্লা রাসুল মুর্শিদ ভজা
পাগল মনের ধান্ধা গো
ও আল্লা ও আল্লা, আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা
ও আল্লা ও আল্লা, আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা।

ও, তোমার লীলা তোমার খেলা, বোঝে না মোর মন পাগেলা
তোমার লীলা তোমার খেলা, বোঝে না মোর মন পাগেলা
পাগল হাসানের যায় বেলা, পাগল হাসানের যায় বেলা
সইয়া লোকের নিন্দা গো
ও আল্লা ও আল্লা, আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা
ও আল্লা ও আল্লা, আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা।

আন্ধাইরপুরীর মানুষ আমি
ওরে আন্ধাইরপুরীর মানুষ আমি
আন্ধাইর ঘরের বাসিন্দা
ও আল্লা ও আল্লা, আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা
ও আল্লা ও আল্লা, আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা।’

গানটি গাইবার আগে পাগল হাসান সেদিন বলেন, ‘শুধু গানের জগতেই না, যেকোনো সময়, ওয়ার্ড ইজ ওয়ার্ড। কথা দিলে যাইতে লাগব। ঘরো লাশ থইয়াও যাওয়া লাগে। তাই ভাঙা হাতেই আইছি।’

গানের প্রতি কী দরদ, শ্রোতাদের জন্য কী টান!

পাগল হাসানের জীবদ্দশায় ‘আন্ধাইরপুরীর মানুষ আমি’ গানটা যতটা প্রচার পেয়েছিল, মৃত্যুর পর তা আরও উজ্জ্বল ও বেগবান হয়। বাউলশিল্পীদের কণ্ঠে তো বটেই, ওয়াজ মাহফিলেও ইসলামি বক্তাদের কণ্ঠে এ গান মানুষের হৃদয়ে অনুরণন তোলে। তবে হাসান তাঁর জীবদ্দশায় এ গান গাইতে গিয়ে বিভিন্ন সময় পঙ্‌ক্তিতে সংযোজন-বিয়োজন করেছেন। যেমনটা করেছেন তাঁর লেখা আরও অনেক গানের ক্ষেত্রেও।

হাসান তাঁর একাধিক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে তিনি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ গান লিখেছেন। তবে ৭০টার মতো প্রচার পেয়েছে। এ ছাড়া লিখে রাখা ‘হাজারো গানের’ একটা ডায়েরি তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। এমনিতে তিনি তেমন গান শুনতেন না। যদি রাতের বেলায় কোনো গান শুনতেন, তাহলে জহির পাগলার গান শুনে কাটাতেন। জহির পাগলার গায়কির তিনি ভক্ত ছিলেন। এ ছাড়া আবুল সরকারের গানও তিনি শুনতেন। তাঁর ভাষায়, ‘বাট্টি (খাটো) আবুল। তাইনর গান হুনি। ভালা লাগে আমার।’



Source link