প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কতটা কমবে

দেশে সংসদীয় ব্যবস্থায় এখনো ব্যক্তি একাধারে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও ক্ষমতাসীন দলের প্রধান হতে বাধা নেই। অনেকে মনে করেন, এতে সরকার, সংসদ ও দলে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ একজনের হাতে থাকে। এখানে পরিবর্তন আনতে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং সংসদ নেতা হতে পারবেন না।

দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় ঐকমত্য কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়, একই ব্যক্তি একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদে থাকতে পারবেন না। এ বিষয়ে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ দল একমত হয়। তবে এই সিদ্ধান্তে বিএনপিসহ কয়েকটি দল ভিন্নমত দিয়েছে। বিএনপি বলেছে, একটি দল নির্বাচনে জয়ী হলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন আর কে দলীয় প্রধান হবেন, গণতান্ত্রিকভাবে এটা ঠিক করার এখতিয়ার ওই দলের। এটি সংবিধানের বিষয় নয়।

যেভাবে সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছে, তাতে কিছু ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিছুটা কমবে। যেমন নির্বাচন কমিশন গঠন। সরকারি দল, বিরোধী দল ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত একটি বাছাই কমিটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার বাছাই করবে। কমিটি যাদের বাছাই করবে, তাঁদের নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল ও আইন কমিশনে সরাসরি নিয়োগ দিতে পারবেন রাষ্ট্রপতি। এখানে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিছুটা কমবে।

আর এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন, এ বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার এক পর্যায়ে বিএনপি এই প্রস্তাব এনেছিল, তাতে ঐকমত্য হয়েছিল। তবে এ ক্ষেত্রে বিএনপির একটি শর্ত ছিল, তা হলো তারা ১০ বছরের বিষয়টি মানবে, সে ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পদে নিয়োগের পদ্ধতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।

জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় কিছু পরিবর্তন আসবে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের’ পরিবর্তে ‘মন্ত্রিসভার অনুমোদনের’ বিধান যুক্ত করা হবে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা–সম্পর্কিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা অথবা তাঁর অনুপস্থিতিতে বিরোধীদলীয় উপনেতার উপস্থিতি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ প্রস্তাবেও বিএনপিসহ প্রায় সব দল একমত।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে জুলাই সনদে যেসব প্রস্তাব আছে সেগুলোর বাস্তবায়ন হলে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমবে। কিন্তু এসব প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট আছে।

অবশ্য সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ ভিন্নমত জানিয়ে প্রথম আলোতে বিশ্লেষণ লিখেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, প্রধানমন্ত্রীর পদকে গুরুত্বহীন করে তোলা হচ্ছে। তাঁর যুক্তিগুলো আমার এ লেখার প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছিলাম।

নিজাম উদ্দিন আহমদের লেখার প্রতিক্রিয়ায় প্রথম আলোতে ২৮ মার্চ বিশ্লেষণ লিখেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান সিদ্দিক। তিনি সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ওই লেখায় নিজাম উদ্দিন আহমদের যুক্তিগুলো খণ্ডনের পাশাপাশি ক্ষমতার ভারসাম্য কেন প্রয়োজন এবং সেটি কীভাবে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করেন ইমরান। তিনি সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলো ব্যাখ্যা করে লিখেছিলেন, রাষ্ট্রপতিকে এমন কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি, যা প্রধানমন্ত্রীকে গুরুত্বহীন করে ফেলে।

ইমরান আরও লেখেন, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের গঠন হবে: তিনজন সরকারি দল থেকে, তিনজন বিরোধী দল থেকে এবং তিনজন নিরপেক্ষ সদস্য—রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি এবং এমন একজন সংসদ সদস্য, যিনি সরকার বা প্রধান বিরোধী দলের অন্তর্ভুক্ত নন। এই ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো নিশ্চিত করবে যে কোনো একক গোষ্ঠী পুরো কাউন্সিলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।

ইমরানের ভাষ্য ছিল, রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের প্রতিনিধিদের এই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার ফলে এটি কম গণতান্ত্রিক নয়, বরং অধিকতর গণতান্ত্রিক হয়ে উঠবে। প্রধানমন্ত্রী হয়তো সব সময় এই নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। কিন্তু ঠিক এ কারণেই জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের প্রয়োজন; নিয়োগপ্রক্রিয়া ন্যায়সংগত রাখা এবং তা যেন কোনো একক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে না থাকে, সেটা নিশ্চিত করা।



Source link