প্রথম আলো ট্রাস্টের একটি নিয়মিত আয়োজন হলো ‘অদ্বিতীয়ার গল্প’। এ আয়োজনে আইডিএলসি-প্রথম আলো ট্রাস্টের ‘অদ্বিতীয়া’ শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া একজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অনলাইন এই আয়োজনে ২০২৬ সালের ০১ মার্চ বেলা ২টায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ২০২২ সালে এই বৃত্তি পাওয়া কুসুম মুন্ডাকে। মৌলভীবাজার জেলার রাজনগরে অবস্থিত করিমপুর চা-বাগানের মেয়ে কুসুম মুন্ডা। তিনি চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। পরিবারের প্রথম নারী হিসেবে স্নাতক পর্যায়ে যাওয়া এবং তাঁর স্বপ্নের কথাগুলো ওঠে এসেছে এ অনুষ্ঠানে। আয়োজনটি একযোগে সম্প্রচারিত হয় প্রথম আলো ও প্রথম আলো ট্রাস্টের ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে। সভাটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা। প্রশ্ন উত্তর আলোকে অনুষ্ঠানের চুম্বক অংশ নিয়ে লিখেছেন মো. নাজিম উদ্দিন।
‘অদ্বিতীয়ার গল্প’ অনুষ্ঠানের এ পর্বে আমাদের সঙ্গে অতিথি হিসেবে আছেন কুসুম মুন্ডা। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। কুসুম, আপনাকে আমাদের অনুষ্ঠানে স্বাগতম। কেমন আছেন আপনি?
কুসুম মুন্ডা: ধন্যবাদ আপনাকে। আমি ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন?
আমিও ভালো আছি। কুসুম, আপনি আমাদের ২০২২ ব্যাচের অদ্বিতীয়া এবং বর্তমানে আপনার প্রথম বর্ষ প্রায় শেষের দিকে। একদম শুরুতেই আপনার কাছে জানতে চাই, চা বাগানের এক নিভৃত অঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের খবর আপনি কীভাবে পেলেন? আপনার সেই শুরুর দিকের অনুভূতিটা কেমন ছিল?
কুসুম মুন্ডা: আসলে আমি যখন ইন্টার লেভেলে পড়তাম, তখনই প্রথম এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন (এইউডব্লিউ) সম্পর্কে জানতে পারি। আমাদের এলাকায় কয়েকজন দাদা রয়েছেন যারা আমাদের গাইড করেন, বিশেষ করে বিজয় দাদা—তাঁর মাধ্যমেই আমি জানতে পারি যে চট্টগ্রামে মেয়েদের জন্য এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখানে পাঁচ বছরের ফুল ফ্রি স্কলারশিপে পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এর আগে আমি জানতামই না যে আমার মতো মেয়েদের জন্য এত বড় একটি সুযোগ আছে। আর ‘অদ্বিতীয়া’ বৃত্তি সম্পর্কে জানতে পেরে আমার মনে হয়েছিল, আমাদের মতো চা বাগান থেকে আসা মেয়েদের জন্য এটি এক বিশাল আশীর্বাদ। আমরা যারা পরিবারের প্রথম মেয়ে, তাদের অনেক বাধা পেরিয়ে এখানে আসতে হয়। অদ্বিতীয়া থেকে এই সহযোগিতা পাওয়ার পর আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে যে আমি সত্যিই পড়াশোনাটা এগিয়ে নিতে পারব।
আপনার ছোটবেলার গল্পটা একটু শুনতে চাই। চা-বাগানের পরিবেশে বড় হওয়া এবং সেখান থেকে আজকের এই অবস্থানে আসা—নিশ্চয়ই পথটা সহজ ছিল না। আপনার শৈশব কেমন কেটেছে?
কুসুম মুন্ডা: আমার জীবনের লড়াইয়ের গল্পগুলো আপনাদের মাধ্যমে সবাইকে জানাতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ। চা-বাগানের জীবন আর সাধারণ জীবনের মধ্যে অনেক তফাৎ। একটি সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছিল, ‘১৭০ টাকা দিয়ে চলে কুসুমের পরিবার’। আপনি কল্পনা করতে পারেন, বর্তমান যুগে মাত্র ১৭০ টাকা মজুরিতে যেখানে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া মেনটেইন করা যায় না, সেখানে পড়াশোনার কথা চিন্তা করা কতটা বিলাসিতা ছিল।
আমার পড়াশোনা শুরু হয়েছিল বাগানের একটি প্রাইমারি স্কুলে, যার নাম ছিল ‘নির্মল শিক্ষাকেন্দ্র’। প্রাথমিক পর্যায়ে খুব একটা অসুবিধা হয়নি, কিন্তু সমস্যা শুরু হলো যখন হাই স্কুলে উঠলাম। স্কুল ছিল অনেক দূরে, হেঁটে যেতে হতো। আমার মা-বাবা আমাকে টিফিনের জন্য মাত্র ১০ টাকা দিতেন। আমি সেই টাকাটা খরচ না করে জমিয়ে রাখতাম যাতে ভালো খাতা-কলম কিনতে পারি। আমার খুব শখ ছিল হাতের লেখা সুন্দর করার। প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য আমাদের ছিল না, তাই বাগানের কোচিং সেন্টার আর নিজের চেষ্টাতেই মাধ্যমিক পর্যন্ত এসেছি।
আপনি বিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছেন। চা-বাগানের সীমাবদ্ধ পরিবেশে বিজ্ঞান বেছে নেওয়াটা তো বেশ সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল। এর পেছনে বিশেষ কোনো স্বপ্ন ছিল কি?
কুসুম মুন্ডা: হ্যাঁ, স্কুলে আমাদের শিক্ষকেরা বলতেন বিজ্ঞান নিয়ে পড়লে ডাক্তার হওয়া যায়। তখন থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু বিজ্ঞানের বিষয়গুলো বোঝার জন্য যে গাইডেন্স বা প্রাইভেট টিউটর দরকার, তা দেওয়ার সামর্থ্য আমার বাবা-মার ছিল না। আমি স্কুলের স্যারদের অনুরোধ করতাম সাহায্য করার জন্য। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় আমি প্রচণ্ড পরিশ্রম করতাম। সারা দিন বাড়ির কাজ করার পর রাতে হারিকেনের আলোতে পড়াশোনা করতাম। অনেক সময় পড়তে পড়তেই বই নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম, আবার সকালে ঘুম ভেঙে দেখতাম বই কোলেই পড়ে আছে। আমার লক্ষ্য ছিল টপার হওয়া, ভালো রেজাল্ট করা।
কিন্তু আমরা জানি আপনার এই যাত্রায় এক ভয়াবহ অসুস্থতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই সময়টার কথা যদি একটু বলতেন।
কুসুম মুন্ডা: ওটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপে আমি ক্লাস টেনে থাকাকালীন ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ি। অসুস্থতা এতটাই গুরুতর ছিল যে আমি সেবার এসএসসি পরীক্ষাই দিতে পারিনি। আমার বাবা-মা চা বাগানের শ্রমিক হয়েও আমাকে বাঁচানোর জন্য সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলেন। আমাদের যা কিছু সম্পদ ছিল—জমি, গাছ, গরু—সব বিক্রি করে আমার চিকিৎসা করিয়েছেন। প্রায় ২০-৩০ জন ডাক্তার দেখানো হয়েছিল, কিন্তু কেউ রোগ ধরতে পারছিলেন না। আমি বেঁচে থাকব কি না, তা নিয়েই সবাই আশঙ্কায় ছিল। টানা দুই বছর আমি শয্যাশায়ী ছিলাম। কিন্তু আমার মনের ভেতর জেদ ছিল যে আমাকে পড়তেই হবে। অসুস্থ অবস্থায় শুয়ে শুয়েই আমি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতাম। যখন শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে যাই, আমার মা আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন পাছে আমি রাস্তায় পড়ে না যাই। এভাবেই অনেক কষ্ট করে আমি এসএসসি ও এইচএসসি পার করি।
আপনার ছোটবেলার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়া, কিন্তু এখন আপনি বিসিএস দিয়ে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। এই স্বপ্ন পরিবর্তনের পেছনের কারণ কী?
কুসুম মুন্ডা: বাস্তবতা অনেক সময় আমাদের স্বপ্ন বদলে দেয়। আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও চান্স পেয়েছিলাম, কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে সেখানে ভর্তি হতে পারিনি। সবশেষে ফুল ফ্রি স্কলারশিপ পেয়ে আমি এইউডব্লিউতে আসি। আর শিক্ষকতাকে বেছে নেওয়ার কারণ হলো, আমি অনুভব করেছি আমার চা-বাগানের মানুষেরা শিক্ষার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। আমি ডাক্তার হতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু শিক্ষক হয়ে আমি আমার কমিউনিটির অনেক অভাবী মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়াতে পারব। আমি চাই আমার মাধ্যমে আমাদের বাগানে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ুক।
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে ক্লাসরুম থেকে শুরু করে রুমমেট—সবই আন্তর্জাতিক এবং ভাষা মাধ্যম ইংরেজি। বাংলা মিডিয়াম থেকে গিয়ে এই ইংরেজি ভাষার পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়াটা কেমন ছিল?
কুসুম মুন্ডা: ওটা ছিল আরেক যুদ্ধ! প্রথম দিকে ক্লাসে যখন শিক্ষকেরা ইংরেজিতে লেকচার দিতেন, আমার মনে হতো সব মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। আমি ক্লাসগুলো ফোনে রেকর্ড করে নিয়ে আসতাম এবং রুমে এসে বারবার শুনতাম। তবে আমি দমে যাইনি। আমি চেয়েছিলাম আমার এই দুর্বলতাকেই শক্তিতে রূপান্তর করতে। আমি নিজে নিজে ছাদের ওপর গিয়ে ইংরেজিতে কথা বলার প্র্যাকটিস করতাম, ভিডিও করতাম এবং অন্যদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতাম। এখন যদি আমাকে ইংরেজিতে দক্ষতা নিয়ে নম্বর দিতে বলেন, আমি নিজেকে ১০ এর মধ্যে ৮ দেব।
আপনার এই আত্মবিশ্বাস সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। আপনার মতো যারা ভবিষ্যতে প্রতিকূল পরিবেশ থেকে এমন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে আসবে, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
কুসুম মুন্ডা: আমি বলব, শুরুটা কঠিন হলেও হাল ছাড়া যাবে না। সবার সঙ্গে মেলামেশা করা এবং বিশেষ করে ইংরেজি বলার অভ্যাস করাটা খুব জরুরি। ভয় না পেয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বললে বন্ডিং তৈরি হয় এবং পরিবেশটা সহজ হয়ে যায়। চেষ্টা করলে যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব।
অনেক ধন্যবাদ কুসুম। আপনার জীবনযুদ্ধের গল্প আমাদের সবার জন্য এক বড় শিক্ষা। আপনার শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন সফল হোক এবং আপনি আপনার কমিউনিটির মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিন—এই শুভকামনা রইল।
কুসুম মুন্ডা: আপনাদেরও অনেক ধন্যবাদ।
