নিয়াজ আসাদুল্লাহ: অন্তর্বর্তী সরকার এবং ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচন অর্থনীতিকে মসৃণভাবে নিম্ন মূল্যস্ফীতি, নিম্ন সুদ ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি। বলা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড়জোর পুনরুদ্ধারের একটি নাজুক পর্যায়ে রয়েছে। স্বজনতোষী পুঁজিবাদী কাঠামো এবং চরমভাবে দলীয়করণ হওয়া আমলাতন্ত্র—এই দুইয়ের ভারে অর্থনীতি এখনো জর্জরিত। এগুলো মূলত ২০১০-পরবর্তী স্বৈরতান্ত্রিক আমলের উত্তরাধিকার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন কিছু অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকার আমলের শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া অস্বচ্ছ শুল্ক বা ট্যারিফ চুক্তির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা এক বড় ধরনের ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে। তাঁদের ওপর একই সঙ্গে তিনটি বিষয়ে চাপ রয়েছে—মুদ্রানীতি শিথিল করা, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রায় দুই দশক ধরে যাঁরা অর্থনৈতিক সুবিধাবঞ্চিত ছিলেন, তাঁদের জন্য ঋণের সুবিধা বাড়ানো। বলা বাহুল্য, এই লক্ষ্যগুলো একটি অন্যটির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এসবের মধ্যে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও বড় চ্যালেঞ্জটি হলো মূল্যস্ফীতি। প্রায় তিন বছর ধরে মূল্যস্ফীতির হার দুই অঙ্কের ঘরের কাছাকাছি আটকে আছে, যার ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতার এই সময়ে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা সামাল দেওয়া এবং সরবরাহের সীমাবদ্ধতাগুলো সম্পর্কে জনগণকে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সরকারের সামনে দ্বিতীয় প্রধান চ্যালেঞ্জটিকে একধরনের দেশীয় ‘বিনিয়োগ খরা’ বলা যেতে পারে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে, ব্যাংকিং খাতে তীব্র তারল্যসংকট চলছে এবং পুঁজিবাজারও দুর্বল হয়ে আছে। তাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা না গেলে এই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া খুবই ধীরগতির হবে।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি মূলত রাজনৈতিক অর্থনীতির। সেটি হলো, জনগণের অর্থনৈতিক স্বস্তির জোরালো দাবি মেটানোর পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা সরকার কীভাবে তৈরি করবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে একদিকে আইএমএফের শর্তভিত্তিক সংস্কার প্রতিশ্রুতি এবং অন্যদিকে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান থেকে তৈরি হওয়া প্রত্যাশার মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
সরকারের এই ত্রিমুখী টানাপোড়েন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে ব্যাংকিং খাতে। বিশাল খেলাপি ঋণের বোঝায় জর্জরিত ও গভীর সংকটে থাকা একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা বর্তমান সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে ঋণসুবিধার জন্য প্রচণ্ড চাপ বাড়ছে। তাই সরকারের কাছে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো অতীতের মতো রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ বিতরণের সংস্কৃতি ফিরিয়ে না এনে, প্রকৃত উৎপাদনশীল খাতগুলোয় কীভাবে অর্থায়ন বাড়ানো যায়, তা নিশ্চিত করা।
