হুমায়ূন আহমেদের ‘শবযাত্রা’ গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ৬ নভেম্বর প্রথম আলোর প্রথম বর্ষের তৃতীয় সংখ্যার ‘শুক্রবারের সাময়িকী’তে। তখনো প্রথম আলো অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়নি, তাই গল্পটি এত দিন শুধু ছাপা পত্রিকার পাতাজুড়েই ছিল। গল্পটি আজ প্রথমবারের মতো অন্য আলোর অনলাইন পাঠকের জন্য উপস্থাপন করা হলো।
আমি আগ্রহ এবং কৌতূহল নিয়ে মানুষটাকে দেখছি। গ্রামের আর দশটা মানুষের থেকে তাকে আলাদা করার কিছু নেই। কাঁচা-পাকা চুল, রোদে জ্বলে যাওয়া খসখসে চামড়া, চোখে ভরসাহারা দৃষ্টি। মানুষটা আমার সামনে বেঞ্চিতে বসে আছে। বসে থাকার ভঙ্গিটাও ক্লান্তির। মনে হচ্ছে এক্ষুনি ঘুমিয়ে পড়বে। আমাদেরকে ঘিরে বেশ কিছু লোকজন। তাদের চোখেও কৌতূহল। তারা মজার কোনো কিছুর জন্যে প্রতিক্ষা করছে।
আমি লোকটার দিকে একটু ঝুঁকে এসে বললাম, আপনার নাম কী?
লোকটা সহজভাবে উত্তর দিল, আমার নাম রহমান মিয়া।
আমাদের চারপাশে যারা দাঁড়িয়ে, তারা এই উত্তরেই মনে হয় মজা পেয়ে গেছে। এ ওর দিকে তাকাচ্ছে। সবার মুখেই চাপা হাসি। রহমান মিয়া নাম শুনে হাসি পাওয়ার কী আছে বুঝতে পারছি না। লোকটাকে দ্বিতীয় কী প্রশ্ন করব, তা–ও বুঝতে পারছি না। এটা পরিষ্কার বুঝতে পারছি যে চারপাশের কৌতূহলী দর্শক চাচ্ছে আমি লোকটির সঙ্গে কথা বলি।
‘আপনার শরীর ভালো?’
‘জি ভালো।’
‘আপনার ছেলেমেয়ে কী?’
‘সর্বমোট চারজন।’
উপস্থিত দর্শকদের একজন বলল, স্যার, ছেলেময়েদের নাম জিজ্ঞেস করেন।
যে ভঙ্গিতে সে কথাটা বলল, তাতে বোঝা যাচ্ছে নাম জিজ্ঞেস করার পরই আসল মজা শুরু হবে। কাজেই আমি লোকটির দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনার ছেলেমেয়েদের নাম কী?
রহমান মিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল, নাম ইয়াদ নাই।
দর্শকরা অনেকেই চাপা হাসি হাসল। একটা মানুষ তার ছেলেমেয়েদের নাম মনে করতে পারছে না। এর মধ্যে হাস্যরসের কিছু নেই। ঘটনাটা বেদনাদায়ক। অথচ অনেকেই হাসছে।
স্যার, আপনি জিজ্ঞেস করেন তার বাবার নাম কী?
আমি জিজ্ঞেস করলাম, রহমান মিয়া, আপনার বাবার নাম কী?
রহমান মিয়া শান্ত গলায় বলল, আমার বাবার নাম ইয়াদ নাই। বিস্মরণ হয়েছি।
দর্শকদের হাসি প্রবল হলো। আমার মনটাই খারাপ হলো। স্মৃতিশক্তি নষ্ট হওয়া কষ্টের ব্যাপার। হাসির বাপার না। এটা নিয়ে মজা করার কিছু নেই। অথচ গ্রামের মানুষরা হৃদয়হীনের মতো কাজটা করছে। এখানে এসে পৌঁছার পর থেকে বলছে, ‘রহমান মিয়ারে খবর দিয়া আনতেছি। বড় মজা পাবেন।’
সেই রহমান মিয়াকে আনা হয়েছে। সবুজ রঙের লুঙ্গি এবং সাদা রঙের একটা চাদর গায়ে সে ক্লান্ত ভঙ্গিত আমার সামনে বসে আছে। বেচারা তার ছেলেমেয়েদের নাম মনে করতে পারছে না, বাবার নাম মনে করতে পারছে না। গ্রামের মানুষেরা এতেই মজা পাচ্ছে। অথচ আমি পাচ্ছি না। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে লোকটির আলঝেইমার ডিজিজ হয়েছে। যে রোগ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগানের হতে পারে, সেই রোগ নেত্রকোনা জেলার কলঘাটি গ্রামের রহমান মিয়ারও হতে পারে। রোগ মানুষ বিচার করে না।
দর্শকদের মধ্যে অতি উত্সাহী একজন বলল, স্যার, আপনি জিজ্ঞেস করেন কেন সে ছেলেমেয়ের নাম বিস্মরণ হয়েছে, বাবার নাম বিস্মরণ হয়েছে।
আমার আর কিছুই জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করছে না। ঘুম ঘুম পাচ্ছে। ঘরে ঢুকে শীতলপার্টিতে শরীর এলিয়ে দিতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু আশপাশের মানুষদের এভাবে রেখে যেতেও খারাপ লাগছে। কলঘাটি থেকে এরাই রিকশা ভাড়া করে রহমান মিয়াকে এনেছে। এদের আগ্রহ এবং উত্সাহে পানি ঢেলে দিতেও খারাপ লাগছে। কাজেই আমি বললাম, রহমান মিয়া, ছেলেমেয়েদের নাম আপনি ভুলে গেছেন কেন? বাবার নামই–বা ভুলে গেলেন কেন? কিছু কিছু নাম আছে, কেউ কখনো ভোলে না।
রহমান মিয়া বলল, মৃত্যুর পর সব ভুলে যায়। অল্পদিন আগে মৃত্যু হয়েছে বলে আমার নিজের নামটা মনে আছে।
আমি হতভম্ব হয়ে বললাম, আপনার মৃত্যু হয়েছে মানে কী?
‘গত বৈশাখ মাসে রাত্রি দ্বি-প্রহরে আমার মৃত্যু হয়ছে।’
‘বৈশাখ মাসে আপনি মারা গেছেন। আর এটা হচ্ছে আষাঢ় মাস। অর্থাৎ তিন মাস হলো আপনি মারা গেছেন।’
‘দুই মাস উনিশ দিন।’
দর্শকদের হাসি প্রবল হলো এবং আমিও বুঝলাম কলঘাটি থেকে পঞ্চাশ টাকা রিকশা ভাড়া কবুল করে এই লোকটিকে আমার কাছে আনার কারণ আছে। তবে কারণটা যথেষ্ট না। লোকটির মাথা খারাপ হয়ে গেছে। মাথা খারাপ একজন মানুষ অনেক কিছুই বলতে পারে। তাকে নিয় মজা করা যায় না।
‘আপনি নিশ্চিত যে বৈশাখ মাসে আপনি মারা গেছেন।’
‘জি।’
‘আপনার কবর হয়েছিল, না হয়নি।’
‘কবর খোদা হয়েছিল, কিন্তু আমার কবরে নামায় নাই।’
‘কেন?’
‘আমি তখন উঠে বসেছি। জিন্দা মানুষের মতো কথা বলেছি। পানি খেতে চেয়েছি। সবাই ভাবছে আমি জিন্দা।’
‘আসলে আপনি জিন্দা না?’
‘জি না।’
‘আপনি মারা গেছেন, কিন্তু আপনার ক্ষুধা-তৃষ্ণা সবই আছে?’
‘আছে। আগের চেয়ে অনেক কম। কিন্তু আছে।’
কথোপকথন এই পর্যায়ে বন্ধ করতে হলো। কারণ, আমার নাশতা খাবার ডাক এসেছে। যে বাড়িতে আমি উঠেছিলাম, সে বাড়ির কর্তা (হেডমাস্টার, সোহাগী হাইস্কুল) আমাকে ডাকতে এসেছেন। হেডমাস্টারদের চোখে ভুবনবিখ্যাত যে বিতৃষ্ণা থাকে, সেই বিতৃষ্ণা নিয়ে তিনি রহমানের দিকে তাকালেন। আশপাশের লোকদের দিকে তাকালেন এবং সমস্ত বিতৃষ্ণা চোখের নিমিষে ঢেলে ফেলে আমার দিকে তাকিয়ে মধুর গলায় বললেন, ‘স্যার, একটু বিষয় আছে। ভিতরে আসেন।’
বেশ কিছু নতুন নতুন জিনিস আমি গ্রামে এসে লক্ষ করছি। তার মধ্যে একটি হচ্ছে খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে লোকসমক্ষে উচ্চারণ করা হয় না। ‘স্যার, নাশতা খেতে আসুন’, বলায় কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু আমাকে বলা হচ্ছে—একটা বিষয় আছে। খাওয়াদাওয়াকে ‘বিষয়’ বলা কি গ্রামে সর্বজনীন না এই বাড়িটির বিশেষত্ব, তা এখনো বুঝতে পারছি না।
আমি হেডমাস্টার সাহেবের আশ্রয়ে তিন দিন ধরে আছি। তবে যথেষ্ট আদরযত্ন করছেন। তবে কী কারণে যেন তার ধারণা হয়েছে, আমি ‘বোকা টাইপ’ মানুষ। জগতের জটিলতা থেকে আমাকে দূরে রাখতে হবে। হেডমাস্টার সাহেব এই দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে যাচ্ছেন। পারলে একটা কাচের বৈয়ামে ভরে আমাকে রেখে দিতেন। সেটা সম্ভব হচ্ছে না বলে একটু মনক্ষুণ্ন।
হেডমাস্টার সাহেবের হাতে আমি কী করে পড়লাম, সেই গল্প এখানে অবান্তর। তবু বলে নিচ্ছি, তাহলে আমার অবস্থানটা পরিষ্কার হয়।

একটি দৈনিক পত্রিকায় আমি প্রতি সপ্তাহে কলাম লেখি। কলামের নাম ‘নিজেরে হারায়ে খুঁজি’। হালকা বিষয়বস্তু নিয়ে হালকা কলাম। যেমন ঢাকা নগরীর ভিক্ষুক। নগরীর সৌন্দর্যের এরাও যে একটা অংশ এসব হাবিজাবি। একটা কলাম লিখলাম ঢাকা শহরের অবহেলার পাখি ‘কাক’ নিয়ে। যখন যা মনে আস তা নিয়ে লেখা। যেহেতু কলামগুলো রাজনৈতিক নয়, কাজেই কেউ সেসব গুরুত্বের সঙ্গে পড়ে বলে আমার মনে হয়নি। আমার সব সময় মনে হতো আমি এবং পত্রিকার কম্পোজিটরে আমরা দুজনই ‘নিজেরে হারায় খুঁজি’ কলামের নিবিষ্ট পাঠক।
এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো যখন আমার স্কুলের এক বন্ধু টেলিফোন করে বলল, ‘তোর একটা কলাম পড়ে আমার গায়ের সব লোম খাড়া হয়ে গেছে।’ আমি খুবই চিন্তিতবোধ করলাম। রোমহর্ষক কোনো কলাম লিখেছি বলে মনে পড়ল না। আমি বললাম, কোন লেখাটার কথা বলছ?
সে অতিরিক্ত রকম আগ্রহের সঙ্গে বলল, ওই যে জোছনাস নিয়ে লেখা। দোস্ত, তোর লেখাটা আমি অফিসের সবাইকে পড়ে শুনিয়েছি।
‘ও আচ্ছা।’
‘ও আচ্ছা না। মারাত্মক লিখেছিস। স্কুলে র্যাপিড রিডারে পাঠ্য হবার মতো লেখা অনেক শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে।’
বন্ধুর উত্সাহে নিজেকে যুক্ত করতে পারলাম না। কারণ, লেখাটা এমন কিছু না। আমার অন্য সব লেখার মতোই হালকা, গভীরতাহীন। লেখাতে আমি ঢাকার মেয়রকে অনুরোধ করেছিলাম, নগরবাসীকে পূর্ণিমা দেখার তিনি যেন একটা ব্যবস্থা করে দেন। ভরা পূর্ণিমার সময় ঢাকা নগরে তিনি যেন দুই ঘণ্টার জন্যে হলেও ইলেকট্রিসিটি অফ রাখেন। সেখান থেকে চলে গেছি গ্রামের বাঁশঝাড়ের পূর্ণিমায়। যে পূর্ণিমার নাম কাজলা দিদির পূর্ণিমা। লেখাটি শেষ করেছি গৃহত্যাগী পূণিমায়। যে পূর্ণিমায় রাজকুমার সিদ্ধার্থ স্ত্রী-পুত্র ছেড়ে গৃহত্যাগ করেছিলেন।
আমার বন্ধু বলল, দোস্ত তুই আমাকে পারমিশন দে, আমি তোকে কাজলা দিনির বাঁশবাগানের জোছনা দেখিয়ে আনব। তখন তুই এ রকম আরেকটা লেখা লিখতে পারবি।
আমি বললাম, আচ্ছা।
‘তোর অ্যাপয়েনমেন্ট বুকে লিখে রাখ নেক্সট পূর্ণিমা কাজলা দিরি বাঁশবাগানের জোছনা। কথা দিচ্ছিস?’
‘পূর্ণিমার তো দেরি আছে। এখনই কথা দিতে হবে?’
হ্যাঁ, এখনি কথা দিতে হবে। আমি সরকারি চাকরি করি। তোর মতো ঝাড়া হাত-পা না যেন যখন তখন যেখানে ইচ্ছা সেখানে যেতে পারি। আমাকে আগেই ছুটির দরখাস্ত করতে হবে। বল, ইয়েস।
আমি ইয়েস বলে ফেঁসে গেলাম। আমাকে একা নেত্রকোনা জেলার এই অতি অজপাড়া গায়ে এসে উপস্থিত হতে হয়েছে। কারণ, বন্ধু শেষ মুহূর্তে ছুটি পায়নি। যেহেতু আগেই সব খবর দেওয়া, আমাকে একাই আসতে হয়েছে। আমি না এলে বন্ধুর ইজ্জত থাকে না। সে কারও কাছে মুখ দেখাতে পারবে না।
পূর্ণিমা দেখার যে বিপুল আয়োজন হয়েছে তা খুবই হাস্যকর, কিন্তু আমি হাসতেও পারছি না। হেডমাস্টার সাহেবের বাড়ির কাছে বিশাল এক বাঁশবন শলার ঝাড়ু দিয়ে ঝেড়ে পরিষ্কার করা হয়েছে। জঙ্গলে যা হয় বাঁশগাছের সঙ্গে অন্য কিছু গাছও থাকে। সেই সব গাছ কুড়াল দিয়ে কেটে পরিষ্কার করা হয়েছে। কারণ, হেডমাস্টার সাহেবকে জানানো হয়েছে আমি বাঁশবনের জোছনা দেখতে চাই। বনের মাঝখানে চেয়ার-টেবিল পাতা হয়েছে। আমি চেয়ারে বসে টেবিলে হাত রেখে জোছনা দেখব।
সমস্যা হচ্ছে তিন দিন ধরে আকাশ মেঘলা। চাঁদের দেখা নেই। গত রাতে পূর্ণিমা ছিল, চাঁদের দেখা পাওয়া যায়নি। বৃষ্টি পাওয়া গেছে। সারা রাতই বৃষ্টি হয়েছে। আজ বৃষ্টি না হলেও আকাশ মেঘে মেঘে কালো। আমি এক শ ভাগ নিশ্চিত সন্ধ্যার পর থেকে বৃষ্টি শুরু হবে। আমি তাতে মোটেই দুঃখিত বোধ করছি না। আগামীকাল সকালে ঢাকায় চলে যেতে পারছি এতেই আমি আনন্দিত। পুরোপুরি নগরবাসী মানুষের জন্যে গ্রামের সব অভিজ্ঞতা সুখকরও না। গ্রামে বাস করতে এলে ধাক্কা খেতেই হবে।
ঢাকা শহরে আমি নিশ্চয়ই এমন কাউকে পাব না যার ধারণা গত দুই মাস উনিশ দিন ধরে সে মৃত। যদি কেউ থেকেও থাকে, তার আত্মীয়স্বজন তার চিকিত্সা করবে। যত্ন করে ঘরে রেখে পুষবে না। দর্শনীয় বস্তু হিসেবে তাকে ভাড়া করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেবেও না।
হেডমাস্টার সাহেবের সব আয়োজনেই বাড়াবাড়ি থাকে। বৈকালিক নাশতার আয়োজন গুরুতর। নাশতা হিসেবে পোলাও করা হয়েছে। পোলাও এবং গরুর ভুনা মাংস।
আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, এটা বিকালের নাশতা?
হেডমাস্টার সাহেব আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, কফি আনিয়েছি। খানার পর কফি আর নোনতা বিস্কুট। আমি যথেষ্ট পরিমাণ আশ্বস্ত হয়ে পোলাও খেতে বসলাম। কারণ, ‘না’ বলে লাভ হবে না। খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে ‘না’ শব্দটির সঙ্গে এরা পরিচিত নয়। অতি সুখাদ্যও যে মাঝে মাঝে খেতে ইচ্ছে করে না এই ধারণা সম্ভবত গ্রামের মানুষের নেই।
ঘিয়ে জবজবা পোলাও মুখে দিতে দিতে বললাম, রহমান মিয়া লোকটা সম্পর্কে হেডমাস্টার সাহেব আপনি কী জানেন?
হেডমাস্টার মুখভর্তি পোলাও নিয়ে বললেন, হারামজাদাকে জুতাপেটা করা উচিত।
আমি বললাম, কেন বলুন তো?
‘ফাজলামি করছে না! সে জিন্দা না মূছা, এটা সে বলার কে? এটা হলো দশজনের বিবেচনা।’
‘আপনাদের বিবেচনায় সে জিন্দা?’
‘অবশ্যই। এমবিবিএস ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে বলেছে।
‘সে যে বেঁচে আছে এটা প্রমাণ করার জন্যে পাস করা ডাক্তার এসেছিল?’
‘জি এসেছিল। পালস দেখেছে। ব্লাড প্রেসার মেপেছে। সব নরমাল।’
‘একটা লোক কথা বলছে, হাঁটছে, খাচ্ছে। সে যে বেঁচে আছে তাঁর জন্যে এটাই যথেষ্ট না? পালস দেখতে হবে, ব্লাড প্রেসার মাপা লাগে।
‘এরা কি বিশ্বাস করে ফেলেছিল যে রহমান মিয়া মৃত?’
হেডমাস্টার সাহেব চতুর্থবারের মতো তাঁর প্লেটে পোলাও নিলেন। জিন্দা লাশকে দেখে আমি যেমন অবকা হয়েছিলাম, প্রায় সুতার মতো মরা হেডমাস্টার সাহেবের খাওয়া দেখেও প্রায় তেমন অবাকই হচ্ছি। আমি খাওয়া শেষ করে হাত গুটিয়ে ফেলেছি দেখে হেডমাস্টার সাহেব সাটির বাকি গোশত প্লেটে ঢালতে ঢালতে বললেন, কফি বানাচ্ছে। কফি খান। তারপর কাঁচা সুপারি দিয়ে একটা পান খেয়ে শুয়ে ঘুম দেন। আকাশের যে অবস্থা আজ বোধ হয় চাঁদ উঠবে না।
‘আপনাকে বলব কী? ষোলো আনা মানুষের মধ্যে দশ আনা বিশ্বাস করে রহমান মিয়া মারা গেছে।’ হেডমাস্টার সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, শিক্ষার আলো এই জন্যেই দিকে দিকে জ্বালানো দরকার। নবীয়ে করিমের (স.) সহি হাদিস আছে, শিক্ষার জন্যে সুদূর চীনে যাও। আছে না?
‘জি আছে।’
হেডমাস্টার সাহেব চতুর্থবারের মতো তাঁর প্লেটে পোলাও নিলেন। জিন্দা লাশকে দেখে আমি যেমন অবকা হয়েছিলাম, প্রায় সুতার মতো মরা হেডমাস্টার সাহেবের খাওয়া দেখেও প্রায় তেমন অবাকই হচ্ছি। আমি খাওয়া শেষ করে হাত গুটিয়ে ফেলেছি দেখে হেডমাস্টার সাহেব সাটির বাকি গোশত প্লেটে ঢালতে ঢালতে বললেন, কফি বানাচ্ছে। কফি খান। তারপর কাঁচা সুপারি দিয়ে একটা পান খেয়ে শুয়ে ঘুম দেন। আকাশের যে অবস্থা আজ বোধ হয় চাঁদ উঠবে না। তবে আপনেরে কথা দিলাম, চাঁদ যত রাতেই উঠুক বাঁশবনে চেয়ার-টেবিল নিয়ে যাব, কফি নিয়ে যাব ফ্লাস্কে করে। আরাম করে জোছনা দেখবেন। জোছনা দেখার সময় যেন মশা ডিস্টার্ব না করে এই জন্যে গ্লোব মার্কা মশার কয়েল আনিয়ে রেখেছি।
আমি বললাম, আপনি আরাম করে ঘুমান। আমার দুপুরে ঘুমিয়ে অভ্যেস নেই। আমি বরং রহমান মিয়ার সঙ্গে গল্প করি।
‘খবরদার, ঐ কাজটা করবেন না।’
অসুবিধা কী? পুরো ব্যাপারা আমার কাছে খুবই ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে।’ ‘যত ইন্টারেস্টিংই মনে হোক। কথা বলবেন না। আমার রিকোয়েস্ট। কথা বললে সমস্যা আছে।’
‘কী সমস্যা।’
কী সমস্যা হেডমাস্টার সাহেব ব্যাখ্যা করলেন না। নিতান্তই নিরীহ একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারে হেডমাস্টার সাহেবের এত অনাগ্রহের কারণ ধরতে পারলাম না। আমি এক কাপে দেড় পোয়া চিনি দিয়ে বানানো কফির পেয়ালা হাতে রহমান মিয়ার সঙ্গে গল্প করতে গেলাম।
আগ্রহী দর্শকরা এখানো আছে। তারা আগে দাঁড়িয়েছিল, এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে। মনে হচ্ছে তারা আরও কিছু ‘মজা’র প্রত্যাশী। আমি রহমান মিয়ার সঙ্গে নিরিবিলি কথা বলতে চাচ্ছিলাম তা বোধ হয় সম্ভব হবে না। আমি চেয়ারে বসতে বসতে কী বলব না–বলব গুছিয়ে নেবার চেষ্টা করলাম। আমার মনে হচ্ছে রহমান মিয়ার মনের ভেতরে কোনো বিচিত্র কারণে একটা ভুল ধারণা ঢুকে গেছে। ভুল ধারণাটা দূর করারও কেউ চেষ্টা করছে না। সবাই মজা পাচ্ছে। ভুল ধারণা দূর করা মানেই তো মজার সমাপ্তি।
‘রহমান মিয়া।’
‘জি।’
‘আপনি যে মারা গেছেন এই বিষয়ে আপনি নিশ্চিত?’
‘জি।’
‘কখনো সন্দেহ হয় না?’
‘না।’
‘এত নিশ্চিত হলেন কীভাবে?’
রহমান মিয়া প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বাঁ হাত উঁচু করে আমাকে দেখান। আমি দেখলাম, হাতের তালুর নিচে চামড়া কালো হয়ে কুঁচকে আছে। কোঁচকানো কালো চামড়া মৃত্যুর প্রমাণ হতে পারে না। আমি কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে আছি। দশর্কদের একজন বলল, ‘কুপির ওপরে হাত ধরছিল। চামড়া পুইড়া গেছে। কোনো দুঃখ পায় নাই।’
চামড়া পুড়ছে কিন্তু ব্যথা পাচ্ছে না, নিশ্চয়ই এর কোনো ব্যাখ্যা আছে। যে স্নায়ু ব্যথাবাধ মস্তিষ্কে নিয়ে যায়, সেই স্নায়ু নষ্ট হয়ে গেছে বা এই জাতীয় কিছু হয়েছে। ডাক্তারের ভালো বলতে পারবেন। কুষ্ঠরোগে এ রকম হয় বলে শুনেছি। ত্বকের অনুভূতি নষ্ট হয়ে যায়।
আমি দর্শকদের দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনাদের কী ধারণা? রহমান মিয়া মৃত?
বৃদ্ধ একজন দার্শনিকদের মতো বলল, আল্লাহর আলমে বহুত অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। সবাই আল্লাহ পাকের কুদরত!
‘অর্থাৎ আপনি বিশ্বাস করছেন সে মৃত।’
‘আমি বিশ্বাসও করি না। আবার ধরেন, অবিশ্বাসও করি না।’
‘সেটা কেমন কথা?’
‘লক্ষণ বিচারে মাঝে মাঝে পাই জিন্দা। মাঝে মাঝে পাই মুর্দা। মুর্দারে কোনো সময় মশায় কামড়ায় না। রহমান মিয়ারেও মশায় ধরে না।’
‘মেয়ে মশা রক্ত খায় তার পেটের ডিমের পুষ্টির জন্যে। রহমান মিয়ার রক্তে হয়তো কোনো সমস্যা আছে যে জন্যে মশারা তার রক্ত খাচ্ছে না।’
‘জি হইতে পারে।’
‘আমার ধারণা রহমান মিয়ার খুব ভালো চিকিত্সা হওয়া দরকার। তার রোগটা মনে। এই রোগ সারাতে হবে।’
‘গরিব মানুষ। ভাত জোটে না আবার চিকিত্সা।’
আমি রহমান মিয়ার দিকে তাকালাম। প্রথমে যেভাবে বসেছিল। এখনো ঠিক সেইভাবেই বসে আছে।
হঠাৎ মনে হলো রহমান মিয়ার মধ্যে খুবই অস্বাভাবিক কিছু আছে। যা বারবার আমার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। অস্বাভাবিকতাটা কি বসে থাকার ভঙ্গির ভেতর, নাকি তাকানোর ভেতর? সে কারও দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। সে তাকিয়ে আছে মাটির দিকে।
‘রহমান মিয়া!’
‘জি।’
‘তাকাও তো আমার দিকে।’
রহমান মিয়া তাকাল। আমি বললাম, আমার দিকে তাকিয়ে থাকুন। না বলা পর্যন্ত চোখ নামাবেন না।
‘জি আচ্ছা।’
রহমান মিয়া তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে অস্বাভাবিকতাটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। সে চোখের পাতা ফেলছে না। একবারও না। নিশ্চয়ই এরও কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু আমার বুকে ধক করে ধাক্কার মতো লাগল। ব্যাপারটা কী? আমার মনে হচ্ছে আমি এই মানুষটাকে চোখের ভেতর দিয়ে অনেক দূর দেখতে পাচ্ছি। যা দেখছি তার সঙ্গে আমার চেনা জানা পৃথিবীর কোনো মিল নেই। আমি নিশ্চিত যে ভয় পেয়েছি বলেই এ রকম মনে হচ্ছে।
‘রহমান মিয়া!’
‘জি।’
‘তুমি মানুষের দিকে চোখ তুলে তাকাও না কেন? সব সময় মাটির দিকে তাকিয়ে থাকো।’
রহমান মিয়া আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল এবং উঠে দাঁড়িয়ে বলল, যাই।
তার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে কেন সে মানুষের চোখের দিকে তাকায় না তা সে জানে, কিন্তু বলতে চাচ্ছে না।
হেডমাস্টার সাহেব বললে—শকুন আসে, শিয়াল আসে, কুকুর আসে। তার বাড়ির সবাই যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। সে এখন থাকে নিজের মতো। কেউ তারে জায়গা দেয় না।
‘তাই নাকি?’
শকুন দেশ থেকে উঠে গিয়েছিল। এই হারামজাদা কোত্থেকে নিয়ে এসেছে। গ্রাম ভর্তি হয়ে গেছে শকুনে।
‘বলেন কী?’
‘গতকালকে আপনি তার সাথে কথা বললেন। সন্ধ্যার সময় দেখি তিনটা শকুন ওড়াউড়ি করছে। শকুন আসা খুবই অলক্ষণ। এই জন্যেই তারে দূরে দূরে রাখি।’
রাতে আমার ঘুম হলো না। রহমান মিয়ার ব্যাপারটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তাড়াবার চেষ্টা করেও পারছি না। নানান উদ্ভট চিন্তা মাথায় আসছে। জীবিতদের মাঝখানে মৃত মানুষরা ঘুরছে এ ধরনের গল্পগাথা পৃথিবীর সব দেশে প্রচলিত। জম্বিদের নিয়ে রীতিমতো গবেষণামূলক গ্রন্থ আছে। কবর দেওয়ার পর মৃত মানুষ জীবিত হয়ে ফিরে আসে। পরিচিতজনদের সঙ্গে বাস করতে আসে। এরা না মৃত, না জীবিত। এরা ‘জম্বি’। ড্রাকুলাদের গল্প তো সবারই জানা। জম্বিদের মতো ড্রাকুলারাও না মৃত, না জীবিত। আমাদের রহমান মিয়া এ রকম কেউ না তো?
আচ্ছা এমন কি হতে পারে রহমান মিয়ার শরীর থেকে আত্মা চলে গেছে?
তাহলে আত্মা ব্যাপারটা কী?
শেষ রাতের দিকে ঘুমুত গেলাম এবং খুব সংগত কারণেই ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম শবযাত্রার দৃশ্য। কবরখানার দিকে যাচ্ছি। আমাদের আগে আগে খাটিয়া যাচ্ছে। তবে খাটিয়াতে কোনো শবদেহ নেই। শূন্য খাটিয়া। শবদেহ আমাদের সঙ্গেই হেঁটে হেঁটে কবরখানার দিকে যাচ্ছে।
ঘুম ভাঙল অনেক বেলায়। হেডমাস্টার সাহেব ডেকে তুললেন। নান্দাইল রোড স্টেশন থেকে বারোটার সময় ট্রেন যাবে ঢাকার দিকে। এখন উঠে রওনা না দিলে ট্রেন ধরতে পারব না। নাশতা রেডি আছে। রিকশাও রেডি। নাশতা খেয়েই রিকশায় উঠতে হবে। হাতে একেবারেই সময় নেই।
অতি দ্রুত হাত মুখ ধুয়ে নাশতা নিয়ে বসলাম। হেডমাস্টার সাহেব গলা নিচু করে বললেন, ঐ হারামজাদা সকাল থেকে এসে বসে আছে। তার সঙ্গে কোনো কথা বলবেন না। নট এ সিঙ্গেল ওয়ার্ড। হারামজাদা বাড়ি চিনে ফেলেছে। এখন রোজ আসবে।
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, কার কথা বলছেন?
‘রহমান মিয়া।’
‘কী চায়?’
‘আপনাকে কী নাকি বলবে? কিচ্ছু বলার দরকার নাই।’
রহমান মিয়ার ওপর হেডমাস্টার সাহেবের তীব্র রাগের কারণ আগেও ধরতে পারিনি। এখনো ধরতে পারলাম না।
নান্দাইল রোড স্টেশনের দিকে রওনা হয়েছি। কাদাভর্তি রাস্তা। অনেক কষ্টে রিকশা টেনে টেনে নেওয়া হচ্ছে। রিকশা ধরে ধরে এগোচ্ছে রহমান মিয়া। আমি বললাম, কিছু বলবে রহমান মিয়া!
‘জি।’
‘বলো শুনি।’
‘কথাটা এখন ইয়াদ আসতেছে না।’
‘মনে পড়ছে না?’
‘জে না।’
‘খুব জরুরি কথা?’
‘জি।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, মনে করার চেষ্টা করো। আরেকটা কথা শোনো—ঢাকায় গিয়েই আমি তোমার বিষয়ে ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলব। সম্ভব হলে তোমাকে ঢাকায় নিয়ে চিকিত্সা করব। ডাক্তারদের সঙ্গে আগে কথা না বলে তোমাকে নিতে চাচ্ছি না।’
‘জি আচ্ছা।’
‘আমাকে যে কথাগুলো বলতে চাচ্ছিলে, সেগুলা কি মনে পড়েছে?’
‘জে না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। মনে করার চেষ্টা করো।’
নান্দাইল রোড স্টেশনে অপেক্ষা করছি। খবর এসেছে ট্রেন এক ঘণ্টা লেট। হেডমাস্টার সাহেব আমার সঙ্গে আছেন। ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে তারপর যাবেন। হেডমাস্টার সাহেব রহমান মিয়াকে আমার ধারেকাছে ঘেঁষতে দিচ্ছেন না। ছাতি হাতে তাকে মারতে পারছেন না। কেন বলুন তে?
হেডমাস্টার সাহেব তিক্ত গলায় বললেন, আরে একটা মরা মানুষের সাথে কী কথা?
‘মরা মানুষ মানে? কি বলছেন আপনি।’
হেডমাস্টার সাহেব থু করে থুথু ফেলে বললেন, মরা না তো কী। ভালো করে তাকায়ে দেখেন, হারামজাদার মাথার ওপরে শকুন উড়তেছে। যেখানে যায় শকুন চলে আসে। দেখেন, নিজের চোখে দেখেন।
আমি দেখলাম, রহমান মিয়া রেইনট্রিগাছের নিচে বেঞ্চিতে বসে আছে। হাতে বাদামের ঠোঙা। বাদাম খাচ্ছে। গাছের ডালে কয়েকটা শকুন। দুটা শকুন রেললাইনের কাছে। এরা রহমান মিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
নিশ্চয়ই এরও কোনো ব্যাখ্যা আছে। ব্যাখ্যা জানি না বলে অস্বাভাবিক লাগছে। আমি বললাম, রহমান মিয়ার বাড়িতেও কি শকুন আসে।
হেডমাস্টার সাহেব বললে—শকুন আসে, শিয়াল আসে, কুকুর আসে। তার বাড়ির সবাই যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। সে এখন থাকে নিজের মতো। কেউ তারে জায়গা দেয় না।
‘তাই নাকি?’
শকুন দেশ থেকে উঠে গিয়েছিল। এই হারামজাদা কোত্থেকে নিয়ে এসেছে। গ্রাম ভর্তি হয়ে গেছে শকুনে।
‘বলেন কী?’
‘গতকালকে আপনি তার সাথে কথা বললেন। সন্ধ্যার সময় দেখি তিনটা শকুন ওড়াউড়ি করছে। শকুন আসা খুবই অলক্ষণ। এই জন্যেই তারে দূরে দূরে রাখি।’
ট্রেন এসে পড়েছে, আমি ট্রেনে উঠলাম। আমাকে ট্রেনে উঠতে দেখে রহমান মিয়া জায়গা ছেড়ে উঠে এল। হেডমাস্টার সাহেব আবারও ছাতা নিয়ে তাকে মারতে যেতে চাচ্ছেন বলে মনে হলো। আমি হেডমাস্টার সাহেবকে হাতে ধরে থামালাম।
রহমান মিয়া জানালার পাশে এসে দাঁড়ান। আমি বললাম, কথাটা মনে পড়েছে?
রহমান মিয়া হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
আমি বললাম, বলো কথাটা কী শুনি।
ট্রেন চলতে শুরু করেছে। জানালা ধরে ধরে রহমান মিয়া এগোচ্ছে। সে বিড়বিড় করে বলল, কথাটা কেউ বুঝব না, আপনে বুঝবেন।
‘বলে ফেলো?’
‘এখন আবার ইয়াদ হইতেছে না।’
রহমান মিয়া হতাশ মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেন তাকে ছেড়ে চলে আসছে। আশ্চর্যের ব্যাপার, দুটা শকুন হেঁটে হেঁটে এগোচ্ছে তার দিকে। শকুনরা যে অবিকল মানুষের মতো হাঁট এই তথ্য আমার জানা ছিল না। জগতের কত কিছুই তো মানুষ জানে না।
