বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এখন কয়েক হাজার বইপত্রের খোঁজ সহজে পাওয়া গেলেও সেসবের অধিকাংশের মান ও গুরুত্ব নিয়ে চিন্তকসমাজের অসন্তোষ গোপন বিষয় নয়। বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-সাহিত্য যেন কানাগলিতে পৌঁছেছে, যেখানে বহুল পরিচিত তথ্যের চর্বিত-চর্বণ করেই প্রতিবছর প্রচুর বাংলা বই প্রকাশিত হচ্ছে। সেগুলোর সাফল্য অবশ্য যতটা না নতুন ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণ বা তথ্যের উপস্থাপনের জন্য, তার চেয়েও বেশি বিশেষ বিবেচনায় সরকারি ক্রয়তালিকায় স্থান লাভের মধ্যেই যেন নিহিত। তার ওপর যুক্ত হয়েছে কথ্য এবং সামাজিক ইতিহাসের নামে অতিসাধারণ ও চিন্তাহীন প্রশ্নে জর্জরিত সাক্ষাৎকার–সংবলিত এবং কাঠামোবিহীন বইপত্রের বাহার। তা ছাড়া যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নানা আঙ্গিকের আলাপের বৈশ্বিক ধারা থেকেও বহুলাংশে বিচ্ছিন্ন রয়ে গেছে দেশীয় চর্চা। মুক্তিযুদ্ধ গবেষণায় এই অচলাবস্থার পেছনে যেসব বাস্তব কারণ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত দলিলপত্র সংগ্রহে নিত্যনতুন উদ্যোগের অভাব। তাছাড়া, অভাবটা কেবল উদ্যোগের নয়, উৎসাহেরও। বাংলাদেশের জাতীয় মহাফেজখানায় মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত নথিপত্র সংগ্রহের সক্রিয় উদ্যোগ না থাকার বিষয়টি হয়তো এর বাস্তব প্রমাণ। পরিস্থিতি যখন এ রকম, তখন যেকোনো অজানা অথচ গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্রের খোঁজ পাওয়া মানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আরও গভীরভাবে ভাবা ও জানার সুযোগ আসা। তা ছাড়া নথিপত্রের গুরুত্ব কেবল নতুন তথ্য লাভের জন্য নয়, পুরোনো শোনা কথা কিংবা স্মৃতিকথায় প্রকাশিত তথ্যের সঠিকতা নির্ধারণের জন্যও সেগুলো প্রয়োজনীয় উৎস হতে পারে। সম্প্রতি প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ও মতিউর রহমান কর্তৃক সম্পাদিত ইংরেজি বই 1971: The Siliguri Conference. Government in Exile Meets the Elected Peoples Representatives: An Untold Story of the Liberation War তেমন একটি আকরগ্রন্থ, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কিছু ধূসর দিক উন্মোচনে গবেষক ও পাঠকদের সাহায্য করবে। বিশেষ করে, মুক্তিযুদ্ধকালীন আওয়ামী লীগের ইতিহাস উন্মোচনে বইটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূত্রপাত ঘটাতে পারে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারকে কী ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছিল, তারও কিছু দালিলিক প্রমাণ বইটিতে পাওয়া যাবে।
১৯৭১–এর জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে প্রধানত আওয়ামী লীগ-দলীয় জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে ভারতের পশ্চিম বাংলার শিলিগুড়িতে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বইটির বিষয়বস্তু হলো যুদ্ধকালীন এই সম্মেলন বিষয়ে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর কিছু নথি। প্রধানত চারটি অংশে বিভক্ত এই বইটির প্রথমেই রয়েছে সম্পাদকের নোট, যেখানে তিনি সংক্ষেপে নথিপত্রের বিষয়বস্তু নিয়ে পাঠককে ধারণা দিয়েছেন। দ্বিতীয় অংশে দেবাশীষ মিত্রের লেখা থেকে আমরা নথিপত্রগুলো উদ্ধারের কাহিনি জানতে পারি। তৃতীয় অংশে লে. ক. (অব.) লুৎফুল হক উক্ত সম্মেলনের একটি বিস্তারিত প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করেছেন এবং চতুর্থ অংশে নথিগুলো সংকলিত হয়েছে।
বিষয়টি এখন সুবিদিত যে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে যে ‘প্রবাসী সরকার’ ১৯৭১ সালের এপ্রিলের ১০ তারিখে ভারত সরকারের পরামর্শে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা নিয়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল (ইমাম ২০০৪: ৭৮)। বলা যায়, বাঙালির নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বাদে সে সময়ে আওয়ামী লীগের অন্য কোনো নেতাই তাঁদের সহকর্মীদের কাছে সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকতে পারেননি। প্রবাসী সরকারের নীতিনির্ধারণী ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতা কিংবা ব্যক্তিত্বের নানা সংঘাত খোদ মুক্তিযুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়েই দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাঙালিদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণার দুই মাসের মধ্যেই রাজনৈতিক অনুযোগ-অভিযোগ, আঞ্চলিকতা আর দলাদলি সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছিল। সম্পাদক মতিউর রহমান জানাচ্ছেন, এ রকম একটি প্রেক্ষাপটেই ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারের নেতাদের একটি সম্মেলন আয়োজনের পরামর্শ দেয়, যেখানে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। উদ্দেশ্য হলো, নিজেদের বিভিন্ন পক্ষের বিপরীতমুখী চিন্তার ব্যবধান কমিয়ে আনা এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন প্রবাসী সরকারের প্রতি মুক্তিফৌজের আস্থা নিশ্চিত করে স্বাধীনতা অর্জনের অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক মতৈক্য প্রতিষ্ঠা করা। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় সামরিক বাহিনীকে, বিশেষ করে ৩৩তম কর্পসকে দায়িত্ব দেওয়া হয় সম্মেলন আয়োজনের এবং তাদের সঙ্গে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সেস বা বিএসএফ–ও যুক্ত ছিল।
নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সদস্যরাসহ ৫-৬ জুলাই অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যরা এবং জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের আওয়ামী লীগ–দলীয় প্রতিনিধিরা। ব্রিগেডিয়ার অজিত কুমার মিত্র; যিনি ৩৩তম কর্পসের সদর দপ্তরের (প্রশাসন) ব্রিগেডিয়ার ইন চার্জ হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন; সম্মেলনটির আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁরই সন্তান, দেবাশীষ মিত্র, ২০০৪ সালে বাবার মৃত্যুর পর ব্যক্তিগত কাগজপত্রের মধ্যে এই নথিপত্রের সন্ধান পেয়ে যান এবং বলা যায়, বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য সম্পাদক ও প্রকাশকের কাছে এই নথিগুলো প্রকাশের জন্য হস্তান্তরের মাধ্যমে তিনি বেশ উদার মনোভাবেরই পরিচয় দিয়েছেন। অবশ্য তাঁর কিংবা সম্পাদকের বিবরণে স্পষ্ট হয়নি, আবিষ্কৃত হওয়ার এত দীর্ঘদিন পর কীভাবে তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল কিংবা নথিগুলোর মূল কপি এখন কোথায় সংরক্ষিত রয়েছে। যা–ই হোক, ৩৩তম কর্পসের সদর দপ্তরের অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত লে. কর্নেল কে এ মজুমদারও এই সম্মেলন ব্যবস্থাপনায় যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া ক্যাপ্টেন এ ডি সুর্ভের উপস্থিতিও নথিপত্র থেকে জানা যায়, যিনি গোয়েন্দা (৬৪৭ ফিল্ড সিকিউরিটি সেকশন) সংস্থার হয়ে সম্মেলন পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। সম্মেলন সম্পর্কে এই তিনজনের প্রতিবেদন নথিপত্রে স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে সম্মেলনে উপস্থাপিত মিজানুর রহমান চৌধুরীর একটি দীর্ঘ বিবৃতি এবং সর্বোপরি সম্মেলনের প্রথম গোপন অধিবেশনের কার্যবিবরণী; যেটি দিয়ে মূলত বইটির নথিপত্র অংশটি শুরু হয়েছে।
