যেকোনো আদর্শ বা বার্তা প্রচারের জন্য শুধু তথ্য জানা যথেষ্ট নয়, বরং তা উপস্থাপনের কৌশল বা প্রজ্ঞা অনেক বেশি জরুরি। সাহাবিরা কেবল ধর্মপ্রচারক ছিলেন না, বরং তাঁরা ছিলেন অনন্য সাধারণ কূটনীতিক।
তাঁদের সেই বিচক্ষণতা ও উপস্থিত বুদ্ধি সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা স্তরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে মূল ভূমিকা রেখেছিল। এই তালিকায় অন্যতম উজ্জ্বল নাম বদরি সাহাবি হাতিব ইবনে আবি বালতাআ (রা.)।
বহুমুখী প্রতিভার এক সাহাবি
হাতিব (রা.) ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, দক্ষ তীরন্দাজ ও দক্ষ ঘোড়সওয়ার। একই সঙ্গে তাঁর ভাষাজ্ঞান ছিল ঈর্ষণীয়; তিনি ছিলেন একজন সাবলীল কবি। দাওয়াতি মিশনের জন্য তাঁর এই ব্যক্তিগত যোগ্যতাসমূহ ছিল অত্যন্ত কার্যকর।
রাজার প্রশ্ন
হোদাইবিয়ার সন্ধির পর যখন আরবে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়, তখন রাসুল (সা.) সমকালীন বিশ্বনেতাদের কাছে ইসলামের বার্তা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
এরই অংশ হিসেবে হাতিবকে পাঠানো হলো মিসরের শাসক মুকাওকিসের কাছে।
দরবারে মুকাওকিস হাতিবকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি যাঁর পক্ষ থেকে এসেছ, তিনি কি সত্যিই আল্লাহর নবী?’ হাতিব (রা.) আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘অবশ্যই।’ তখন মুকাওকিস পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন।
বললেন, ‘যদি তিনি সত্যিই নবী হন, তবে মক্কার লোকেরা যখন তাঁকে নিজ দেশ থেকে বের করে দিচ্ছিল, তখন তিনি তাদের ওপর বদদোয়া করলেন না কেন?’
কালজয়ী যুক্তি
মুকাওকিসের প্রশ্নটি ছিল বেশ জটিল। এখানে আবেগ বা তাত্ত্বিক আলোচনার পরিবর্তে হাতিব (রা.) এক অভাবনীয় উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিলেন। তিনি সরাসরি তর্কে না জড়িয়ে মুকাওকিসের নিজস্ব বিশ্বাসের একটি রেফারেন্স সামনে আনলেন।
বললেন, ‘আপনি তো ইসা ইবনে মারিয়ামকে (আ.) আল্লাহর নবী বলে মানেন। তাঁকে যখন তাঁর নিজের জাতি শূলিতে চড়ানোর চেষ্টা করেছিল, তখন তিনি কেন তাদের ধ্বংসের জন্য বদদোয়া করলেন না?’
মুকাওকিস এমন উত্তরের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। নিজের ধর্মতত্ত্বের এই উদাহরণটি তাঁকে স্তব্ধ করে দিল।
হাতিব (রা.) বুঝিয়ে দিলেন যে নবীদের বৈশিষ্ট্য প্রতিহিংসা নয়, বরং অসীম ধৈর্য ও সহনশীলতা। তাঁরা বদদোয়া করতে আসেননি, এসেছেন মানবতার মুক্তিদাতা হিসেবে।
তাঁর এই চৌকস জবাবে মুগ্ধ হয়ে মুকাওকিস বলেছিলেন, ‘তুমি সত্যিই একজন জ্ঞানী ব্যক্তি, এবং তুমি একজন জ্ঞানীর পক্ষ থেকেই প্রেরিত হয়েছ।’ (সাহারানপুরি, বাজলুল মাজহুদ, ১২/১০১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত: ১৯৯৬ খ্রি.)
আমাদের শিক্ষা
হাতিব (রা.)-এর এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, বর্তমান সময়ের একজন দাঈ বা বক্তার জন্যও শ্রোতার মানসিকতা ও বিশ্বাস বুঝে কথা বলা কতটা জরুরি। কঠিন প্রশ্নের উত্তর যে সরাসরি না দিয়ে পাল্টা যুক্তিতেও সুন্দরভাবে দেওয়া যায়, এটি তারই এক ধ্রুপদি উদাহরণ।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।
