প্রস্তাবিত বাজেট পড়ে প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ল, তা হলো খণ্ড খণ্ড, তবে এতে যথেষ্ট আন্তরিক কিছু প্রচেষ্টা আছে। করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ, উৎসে করকে অগ্রিম করে রূপান্তরের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের সহায়তা এবং অতিরিক্ত উৎসে কর ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা—এগুলো অর্থনীতিকে চাঙা করা এবং মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টার ইঙ্গিত দেয়। কিডনির রোগীদের ডায়ালাইসিস সরঞ্জাম ও হৃদ্‌রোগ চিকিৎসার উপকরণ আমদানিতে কর সুবিধার মতো খুচরা পদক্ষেপও রয়েছে বেশ কিছু।

কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে এই বাজেটে আমি যা দেখছি, তা হলো ‘ফিল গুড’ লক্ষ্যমাত্রার আধিক্য এবং কৌশলগত ধারের স্পষ্ট অনুপস্থিতি।

বাজেট বক্তৃতার শুরুতে দশটি দর্শন (অগ্রাধিকার) উপস্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সর্বজনীন শিক্ষা ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যের মতো লক্ষ্য। কিন্তু এগুলো যখন কার্যক্রমে রূপান্তরিত হয়, তখন কৌশলগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শিক্ষার ক্ষেত্রে বলা যাক। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সর্বজনীন শিক্ষার দর্শনেই চলছে—জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয়, উপজেলায় সরকারি কলেজ। কিন্তু মূল সমস্যাটা এখানেই: আমরা নিম্নমানের সর্বজনীন শিক্ষার একটি চক্রে আটকে গেছি। শিক্ষার বিস্তার ঘটছে, কিন্তু মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না। এই সংকটের উপলব্ধি বাজেটে নেই, ফলে বরাদ্দও সেদিকে যাচ্ছে না। এখন মানসম্মত শিক্ষা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার উদ্যোগ দেখিনি। গতানুগতিকতার দিকেই ঝোঁক বেশি।

স্বাস্থ্য খাতের চিত্রও একই রকম। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য নিঃসন্দেহে সঠিক, কিন্তু বাস্তবে যা হচ্ছে তা হলো অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, সেবা তৈরি হচ্ছে না। চিকিৎসার মান নিম্ন থাকছে, মানুষের খরচের বোঝা বাড়ছে। এই অবস্থায় প্রতিটি উপজেলায় নতুন প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা আবারও সেই একই অবকাঠামো-নির্ভর চিন্তারই প্রতিফলন। অথচ ইউনিয়ন পর্যায়ে ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্য অবকাঠামো রয়েছে—সাবসেন্টার, ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার সেন্টার, কমিউনিটি ক্লিনিক। নতুন বিনিয়োগের আগে বিদ্যমান অবকাঠামোর সমন্বয় ও পুনর্ব্যবহারের কথা ভাবা দরকার ছিল।

কৌশলগত দুর্বলতার আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো ব্যয় অদক্ষতা। দুর্নীতির চেয়েও এটি আমার কাছে বড় সমস্যা বলে মনে হয়। বিশাল বাজেট হচ্ছে, কিন্তু সমানুপাতিক ফলাফল আসছে না। আমাদের মোট বাজেটের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ চলে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়ে, অর্থাৎ সরকার নিজের ওপর খরচ করছে। একাধিক বিনিয়োগ সংস্থা, প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের আলাদা প্রশিক্ষণকেন্দ্র—এই কাঠামোর একটি ব্যাপক পুনর্গঠন দরকার। বাজেটে সে উপলব্ধি নেই বলেই প্রস্তাবিত প্রবৃদ্ধির হার বাস্তবে অর্জিত হবে কি না, সে বিষয়ে আমার সংশয় থেকে যাচ্ছে।

মধ্যমেয়াদি কাঠামো নিয়েও হতাশ হয়েছি। প্রবৃদ্ধির চালকগুলোকে বিবিধ ও শক্তিশালী করার জন্য যে কৌশলগত আলোচনা দরকার ছিল, নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস কোথায়, কীভাবে তা ত্বরান্বিত করা যায়—বাজেট বক্তৃতায় তা প্রত্যাশামতো নেই।

কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথাও বলতে চাই। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে বার্ষিক সাড়ে ৪২ লাখ কৃষকের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর পরিকল্পনা গ্রামীণ অর্থনীতিতে মূলধন সরবরাহের একটি পথ তৈরি করবে। প্রসঙ্গত, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রামের সঞ্চয় শহরে ঋণ হিসেবে চলে যাওয়ার যে প্রবণতা আছে, কৃষক কার্ড তার বিপরীতে গ্রামীণ মূলধন ধরে রাখতে কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে। তবে জিডিপির তুলনায় কৃষি খাতে বরাদ্দ গত বছরের ০.৬৩ শতাংশ থেকে এ বছর ০.৬১ শতাংশে নেমে এসেছে—এটি উদ্বেগের।

ক্রিয়েটিভ ইকোনমি ও স্পোর্টস ইকোনমির ধারণা অন্তর্ভুক্তি নিঃসন্দেহে স্বাগতযোগ্য। কিন্তু পূর্বাচলে একটি ক্রিয়েটিভ হাব নির্মাণের পরিকল্পনায় এলিটমুখী চিন্তার আধিক্যের ঝুঁকি আছে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ সংস্কৃতি ও কারিগর শ্রেণিই ক্রিয়েটিভ ইকোনমির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। তাদের জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও কপিরাইট সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে এই উদ্যোগ সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না।

সবশেষে কথা ও কাজের কিছু অমিলের কথাও বলা দরকার। ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীল করার কথা জোরেশোরে বলা হয়েছে, অথচ বাজেট ঘোষণার সময়েই এ খাতে বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে বিশৃঙ্খলা চলছে। তার নিরসনে উদ্যোগ যথার্থ নয়।

বাজেট প্রস্তাবে মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ার অঙ্গীকার রয়েছে, কিন্তু পদায়নে তার প্রতিফলন নেই। যেমন বিসিবির সাম্প্রতিক নির্বাচনের কথাই ধরা যাক। সেখানে আবার সেই নিজেদের লোকদেরই নেওয়া হলো। একদিকে মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রত্যয়, আবার নিজেদের লোকদের পদায়ন। সেই পুরোনো সংস্কৃতির প্রতিফলন।

ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, অথচ সেই পরিবেশের অন্যতম পূর্বশর্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে সংযোগটি উপলব্ধির জায়গায় জোরালোভাবে আসেনি।

সংক্ষেপে বলতে গেলে বাজেটে আন্তরিকতার ঘাটতি নেই, কিন্তু কৌশলগত দিকনির্দেশনার অনুপস্থিতি এই আন্তরিক প্রচেষ্টাগুলোকে খণ্ডিত রেখে যাচ্ছে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা



Source link