সে সময় অনেক ইমাম ছিলেন, যাঁরা গজল গাইতেন, কিন্তু কৃষ্ণভজনের কথা চিন্তাও করতে পারতেন না। উকিল সেই জায়গাটি ভেঙেছেন—

‘আর নি আসিবে কৃষ্ণ কলঙ্কী রাই না মইলে
হায় গো দূতি কইও গো শ্যামবন্ধুর নাগাল পাইলে।’

এ গানের শেষাংশে এসে উকিল মুন্সী রাধার আঙিনা থেকে সরাসরি সুফি ভাবধারায় প্রবেশ করেছেন, যা এ অঞ্চলের অন্য গীতিকবিদের থেকে উকিলকে আলাদা করে। উকিল বলছেন—

‘উকিলে কয় বড় পাপী আমি হইলাম এই ভুবনে
দয়ানি করিবেন আল্লায় হাশরের দিনে।’

এখানে রাধার বিরহকে তিনি নিজের জীবনের পাপ ও অপূর্ণতার সমান্তরালে দাঁড় করিয়েছেন। সাধক নিজেকে এই ভুবনের ‘বড় পাপী’ হিসেবে স্বীকার করছেন। কৃষ্ণ-বিরহের সমান্তরালে তিনি এখানে শেষ পর্যন্ত স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ করছেন এবং আশা রাখছেন যে শেষ বিচারের দিনে তথা ‘হাশরের দিনে’ দয়াময় আল্লাহ যেন তাঁর প্রতি দয়াপরবশ হন। সুফি দর্শনের ‘ফানা’ বা স্রষ্টার প্রেমে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করা এবং বৈষ্ণব দর্শনের ‘রাধাভাব’ বা কৃষ্ণবিরহে রাধার তনু-মন অঙ্গার হওয়া—এই দুটি ভিন্ন ধারার মূল সুর যে এক, উকিল মুন্সী তাঁর গানে সেটিই অবলীলায় প্রমাণ করেছেন।

উকিল মুন্সী অধিকাংশ গানেই এমন রাধার জবানিতে পরমেশ্বরের বিরহ ফুটিয়ে তুলেছেন, যেখানে লৌকিক প্রেম, সমাজ-নিন্দা এবং সবশেষে পরকালের মুক্তি ও স্রষ্টার করুণা ভিক্ষা—সব এক সুতায় গাঁথা পড়েছে। সুফিবাদ ও কৃষ্ণপ্রেমকে তিনি কখনোই যে আলাদা করে দেখেননি, তা নিচের আরেকটি গানের দুটি লাইন থেকেও আমরা বুঝতে পারি:

‘সখী গো, আমার অন্তিমকালে থাকিও নিকটে
প্রাণ থাকিতে লইয়া যাইও জাহ্নবীর ঘাটে।’

এই লাইনে ‘সখী’ কেবল রাধার সখী নন, বরং জীবনের শেষ লগ্নে পাশে থাকা পরম কোনো সহযাত্রী বা নিজের অন্তরঙ্গ সত্তা। সাধকের আর্তি-মৃত্যুর সেই কঠিন ক্ষণে কেউ যেন তাঁকে একা না ফেলে, বরং তাঁর নিকটেই থাকে।

‘জাহ্নবীর ঘাট’ বলতে মূলত গঙ্গা নদীর ঘাটকে বোঝানো হয়েছে, যা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পরম পবিত্র এবং যেখানে প্রাণত্যাগ করা মোক্ষ বা মুক্তির প্রতীক। একজন মুসলিম লোকসাধক হয়েও উকিল মুন্সী এখানে মুক্তির এক সর্বজনীন, লৌকিক ও ভৌগোলিক প্রতীক ব্যবহার করেছেন, যা এই অঞ্চলের মিশ্র সংস্কৃতির এক অনন্য রূপ।

‘কৃষ্ণ নাম দিও লিখিয়া গঙ্গা মৃত্তিকায়’—এই লাইনে লোকদর্শন স্পষ্ট। বৈষ্ণবমতে, কৃষ্ণ নামের মাহাত্ম্য অপরিসীম। মৃত্যুর সময়ে গঙ্গার পবিত্র মাটি বা তিলকমাটি দিয়ে শরীরে ঈশ্বরের নাম লিখে দেওয়ার এক প্রাচীন রীতি রয়েছে। সাধক চান, শেষ মুহূর্তে তাঁর নশ্বর দেহে যেন সেই পরম আরাধ্যের নাম খোদাই করা থাকে। এখানে ‘কৃষ্ণ’ নামটিকে তিনি কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় গণ্ডিতে না রেখে পরমাত্মা বা পরমেশ্বরের এক লৌকিক প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছেন।



Source link